ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই ফলাফল সত্ত্বেও নতুন সরকার গঠন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ১২০ আসনের নেসেটে কোনো রাজনৈতিক পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন লাভ করতে পারেনি। এই জটিল পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার কয়েক দফা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারা। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রশ্নে বিরোধী শিবিরের ভেতরেই মতপার্থক্য থাকায় সরকার গঠনের পথটি অত্যন্ত বন্ধুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ।
শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট মোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে তাঁর নিজস্ব দল লিকুদ পার্টি অর্জন করেছে ২৭টি আসন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। এছাড়া আরব জোট ও দল জয়েন্ট লিস্ট এবং রাআম যৌথভাবে ১৯টি আসন লাভ করেছে। যদি এই দুই আরব দলের সমর্থন পাওয়া যায়, তবে বিরোধী পক্ষের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭টিতে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে বেশি। উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নেতানিয়াহুকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় বৃহস্পতিবার দফায় দফায় আলোচনায় বসেন বিরোধী শিবিরের নেতারা। ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান আলাদাভাবে রাআম দলের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস, ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকট এবং বি’য়াচাদ দলের নেতা ইয়ার লাপিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি বি’য়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট আইজেনকট ও গোলানের সঙ্গে আলোচনা করেন। এসব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি।
টাইমস অব ইসরায়েল–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ। ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিন দল— ইয়াশার, বি’য়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যুক্ত করে সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৬৭ হলেও বাস্তবে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
টাইমস অব ইসরায়েল আরও জানিয়েছে, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কেবল ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।
গত শুক্রবার ইসরায়েলের উদারপন্থী পত্রিকা হারেৎজ–এ প্রকাশিত একটি মতামত কলামে গোলান আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের জোরালো আহ্বান জানান। ওই কলামে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না।” তাঁর যুক্তি ছিল, একজন আরব নাগরিকের ভোটের মূল্য একজন ইহুদি নাগরিকের ভোটের সমান। কয়েক লাখ নাগরিকের ভোট শুধু তাঁদের পরিচয় বা নামের কারণে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনের এই ফলাফলকে নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষের জয় হিসেবে দেখছেন ইয়ার লাপিদ। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বিরোধীরা সরাসরি নিরঙ্কুশ জয় আশা করেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। তবে নেতানিয়াহুর জোটের আসন আগের পার্লামেন্টের ৬৮ থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে।” লাপিদের ভাষায়, পয়েন্টের ব্যবধানে হলেও বিরোধীরা জিতেছেন। তাঁর মন্তব্য ছিল, “জয় মানেই জয়।”
লাপিদ আরও দাবি করেন, নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসন অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দল দুটি নিজেদের জায়নবাদী বলে মনে করে না। এই ১৩টি আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকা বাকি আসনের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৪০টিতে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তিনি তাঁর ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইহুদিতের চেয়ারম্যান ইতামার বেন–গভিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান ডানপন্থী সরকার টিকিয়ে রাখা এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারীদের সমর্থনপুষ্ট কোনো বামপন্থী সরকার গঠন ঠেকানোর বিষয়ে তাঁরা আলোচনা করেন। একই দিনে আরেক উগ্রপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গেও বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। বৈঠকে পরবর্তী পদক্ষেপ সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। চ্যানেল ১৪-এর বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, নেতানিয়াহু শরিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গেই থাকব।”
সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন গাদি আইজেনকট। তাঁর দল পার্লামেন্ট বসার পরপরই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ অথবা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন এবং বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
আগামী ১০ নভেম্বর ইসরায়েলের নতুন পার্লামেন্টের শপথ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনা শেষ না হলেও নির্ধারিত দিনেই নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হবে। তবে জোট গঠনের আলোচনা অত্যন্ত জটিল হতে পারে এবং দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, আর নেতানিয়াহু নিজের জোট ধরে রেখে অন্য দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।
নির্বাচন ঘিরে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইজেনকট। তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। পেশাদার সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপকে পাত্তা না দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত শেষ করতে দিতে হবে।
একই সঙ্গে আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ সমন্বিতভাবে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচার চালাচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হতে দিতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শিন বেইত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং এর পরিসর অত্যন্ত সীমিত। তদন্তের অজুহাতে আইন মেনে ভোট দেওয়া আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয় বলে তারা মনে করে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনেও ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচন আইন মেনেই পুরো প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ মেলেনি।