ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের সময় আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটারদের প্রভাবিত করতে কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন বিদেশি পক্ষ থেকে অর্থ পাঠানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের দেওয়া বিশেষ নির্দেশে বিদেশি অর্থায়ন এবং নির্বাচনে অনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগগুলো নিয়ে এই তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
সাধারণ নির্বাচনে আরব দলগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছে। ব্যালটের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, আরব দলগুলো সরকার গঠনে ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এই আভাস পাওয়ার পরপরই লিকুদ পার্টি তাদের অভিযোগগুলো সামনে আনে।
বিচারপতি সোলবার্গ শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিকে সংস্থাটির তদন্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। সোলবার্গ তার এক নির্দেশনায় লিখেছেন, ‘নির্বাচনের সময় ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী পক্ষগুলো বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে—এমন গুরুতর সন্দেহের কথা আমার সামনে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি, ওপরের অভিযোগগুলো তদন্ত করতে আপনার ক্ষমতার সবটুকু প্রয়োগ করুন এবং এসব সন্দেহের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করতে জেনারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের ক্ষমতা ব্যবহার করুন।’
শিন বেতের তদন্তের আওতায় বর্তমানে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের পথগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, যেসব নেটওয়ার্ক আগে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া আরব দলগুলোর একটি দল রাআম পার্টির পক্ষে নগদ টাকা এবং ভোটের স্লিপ থাকা খাম জব্দ করার ঘটনাও সামনে এসেছে।
সোলবার্গের নির্দেশনায় পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি, ওপরের অভিযোগগুলো তদন্ত করতে আপনার ক্ষমতার সবটুকু প্রয়োগ করুন এবং এসব সন্দেহের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করতে জেনারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের ক্ষমতা ব্যবহার করুন।’
ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন নিউজের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) নির্বাচনের আগেই নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র কেএএন নিউজকে জানিয়েছে, ‘গত দুই সপ্তাহের মধ্যে পাওয়া নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি, কোথাও কিছু একটা সমস্যা আছে। বিষয়টি পুরোপুরি খতিয়ে দেখতে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। আগামী দিনগুলোতে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।’
উগ্র ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের পর ব্যাপক ভোট জালিয়াতি, অর্থ লেনদেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছে। তারা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
তবে টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার শুরুতে পুলিশ লিকুদ পার্টির এই অভিযোগ খারিজ করে জানিয়েছিল যে, আরব দলগুলো নির্বাচন ‘কারচুপি করে নিজেদের পক্ষে নিয়েছে’—এমন দাবির পক্ষে ‘কোনো প্রমাণ নেই’।
পরবর্তীতে ইসরায়েল পুলিশ কমিশনার ড্যানিয়েল লেভি এক বিবৃতিতে আশ্বস্ত করে বলেন, নির্বাচনের সুষ্ঠুতা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। লেভি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সুষ্ঠুতা লঙ্ঘনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বা এ বিষয়ে কোনো অপরাধ সংঘটনের সন্দেহ হলে তা নিরপেক্ষভাবে ও পুরোপুরি খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্ত করা হবে। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।’
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার সন্দেহ দেখা দিলে ‘পুলিশ সত্য উদ্ঘাটনে দৃঢ়ভাবে তদন্ত করবে এবং জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনবে’।
পুলিশ কমিশনারের বিবৃতিতে পুনরায় বলা হয়, ‘নির্বাচনের সুষ্ঠুতা-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বা এ বিষয়ে কোনো অপরাধ সংঘটনের সন্দেহ হলে তা নিরপেক্ষভাবে ও পুরোপুরি খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্ত করা হবে। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।’
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের নেতা এবং ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকট জানিয়েছেন যে, তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তিনি দাবি করেন, সব অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২৬তম নেসেটের শপথ গ্রহণের তারিখ যেন রাজনৈতিক স্বার্থে প্রভাবিত না হয় এবং কোনো পক্ষ যেন এই পরিস্থিতির সুযোগ না নেয়।
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী উগ্রবাদী ইতামার বেন-গভির গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে নির্দেশ দিয়েছেন ‘কাতারের অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে আরব দলগুলোর নেতাদের’ গ্রেপ্তার করতে। বেন-গভির এই পুরো ঘটনায় মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।