‘আমরা ইতিহাস গড়েছি’, ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোতে যখন বুথফেরত (এক্সিট পোল) জরিপের ফলাফল প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন দলীয় সদরদপ্তর থেকে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিরোধী জোটের প্রধান ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট এই বলে কথা শুরু করেন।
গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর দলীয় কার্যালয় থেকে আইজেনকট বলেন, ‘আগামী বছরগুলোতে দেশটির নেতৃত্ব কে দেবেন, আজ সকালে ইসরায়েলের জনগণ সে বিষয়ে গণভোটের মতো একটি রায় দিয়েছেন। আজ রাতে আমরা আমাদের উত্তর পেয়েছি। জনগণ পরিবর্তনকে বেছে নিয়েছেন। ব্যর্থ জোটের ওপর জনগণ আস্থা হারিয়েছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেন আর প্রধানমন্ত্রী না থাকেন, তার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ইসরায়েলের জনগণ।’
গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৬১টি আসন তাদের হাতে নেই।
অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া প্রধানত আরব সদস্যদের নিয়ে গঠিত দলগুলো ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে গত পাঁচ দশকের মধ্যে এবার রেকর্ডসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন। তবে কোনো একক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠন করতে হলে এখন জোটের অংশীদারদের সংখ্যা বাড়াতে হবে দলগুলোকে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আইজেনকট বলেন, একজন সত্যিকারের নেতা হলে জনগণের রায় মেনে নিতেন এবং আজই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতেন।
উল্লেখ্য, পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড তৈরি হলেও কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা নিশ্চিত করতে জোটের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে।
ইসরায়েলের বিদ্যমান নির্বাচনব্যবস্থা অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণার পর সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। বিশেষ প্রয়োজনে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ আরও ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলগুলো জোট গঠনে ব্যর্থ হলে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইসরায়েলে এমন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার উদাহরণ আগে দেখা গেছে; যেমন ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেখানে মোট পাঁচটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে আইজেনকট বলেন, ‘এত বেশি ভোটার উপস্থিতির একটি নির্বাচনের পর আবার আরেকটি নির্বাচনের দিকে যাওয়া ভুল হবে। জনগণের ইচ্ছার বাস্তবায়নে যা যা করা সম্ভব, তার সবকিছু করা আমাদের দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগতভাবেও এটা আমার দায়িত্ব।’
কয়েক দফা মিলিয়ে প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েল শাসন করছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এবার মিথ্যার যুগ এবং ব্যর্থতার অবসান হতে চলেছে উল্লেখ করে আইজেনকট বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি এমন একটি জায়নবাদী সরকার গঠনে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যে সরকার সবাইকে সেবা দেবে। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, এটি এক পক্ষের ওপর অন্য পক্ষের জয় নয়; বরং এটি পুরো ইসরায়েলি জনগণের জয়।’
জোটের অংশীদারদের নিয়ে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইজেনকট আরও জানান, ইসরায়েলের সকল নাগরিক আইনি সেবা পাবেন। একই সঙ্গে তিনি হামাসকে নির্মূল করার অঙ্গীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সরাসরি হুঁশিয়ার করে আইজেনকট বলেন, ‘নেতানিয়াহু, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করার সাহস আপনি দেখাবেন না।’
সবশেষে আইজেনকট তাঁর ও তাঁর দলের হয়ে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।