দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের পদ শূন্য পড়ে থাকার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, চিকিৎসকদের কোথায় পদায়ন করা হবে এবং কীভাবে তাঁদের কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডের শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত '৩২তম জাতীয় সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার–২০২৬' এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির capacity-তে এই কথাগুলো বলেন জাহিদ হোসেন। বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং এই সেমিনারের আয়োজন করেছে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্যের পর তাঁর উদ্দেশে সরাসরি কথা বলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার তো দিতেই পারেন না। ডাক্তার পোস্ট ভূরি ভূরি খালি।’

দেশের প্রান্তিক এলাকার স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র তুলে ধরে জাহিদ হোসেন নীলফামারী, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, রাঙামাটি এবং কক্সবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে চিকিৎসকের পদ খালি থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী মনে করেন, বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁদের যথাযথ ব্যবহারের একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না, চিকিৎসকদের বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতালে কীভাবে পদায়ন করা হবে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

রেডিওলজিস্টদের পদায়নের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে টেনে জাহিদ হোসেন বলেন, কোনো হাসপাতালে একজন রেডিওলজিস্ট পাঠানোর আগে সেখানে আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র সচল আছে কি না, রেডিওগ্রাফার আছেন কি না, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব মৌলিক সুবিধা না থাকলে চিকিৎসকেরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হবেন না।

তিনি আরও বলেন, “পরিকল্পনা না করলে মানুষ স্বাভাবিকভাবে যেখানে কাজ করার সুবিধা আছে, সেখানে যেতে চাইবে।” এই সমস্যা সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের রোগীদের যেন রংপুর বা বগুড়ার বাইরে যেতে না হয়, সে অনুযায়ী আঞ্চলিক হাসপাতালগুলোকে গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসার সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে।

চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, রেডিওলজি ও ইমেজিংয়ের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় দক্ষ জনবল তৈরি করতে প্রশিক্ষণ এবং হাতেকলমে শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি হাসপাতালগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের রিসোর্স কনস্ট্রেইন্টের কান্ট্রির নাম বাংলাদেশ।’ সরকারের বরাদ্দ করা অর্থ ও চিকিৎসার সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংয়ের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আওসাফ আলীর সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংয়ের মহাসচিব অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশীদ এবং মহাসচিব মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকেরা অংশগ্রহণ করছেন। সকালে বৈজ্ঞানিক অধিবেশনের মাধ্যমে সম্মেলনের সূচনা হয়। উদ্বোধনী পর্বের পর আরও একটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশন, বিকেলে বার্ষিক সাধারণ সভা, সন্ধ্যায় পুরস্কার বিতরণী এবং রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরো আয়োজনটি সম্পন্ন হবে।