কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় বারোমাসিয়া নদীর ওপর নির্মিত একটি বাঁশের সাঁকোর অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন দুই পাড়ের অন্তত আটটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। প্রায় দুই থেকে তিন মাস ধরে সাঁকোটি এই জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকলেও এখন পর্যন্ত তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জীবনপণ ঝুঁকি নিয়ে কেউ বুকসমান পানি পেরিয়ে, কেউ সাঁতরে, আবার কেউ ভাঙা কাঠামোর ওপর দিয়ে নদী পারাপার হতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ এই বাঁশের সাঁকোটির দক্ষিণ পাশের মাঝামাঝি প্রায় ১৫০ ফুট অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। বর্তমানে এই পথ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। দেখা গেল, কেউ বুকসমান পানিতে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন, কেউবা সাঁতরে যাচ্ছেন। আবার অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা অংশের ওপর দিয়ে পারাপারের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, প্রায় চার দশক আগে এই নদী পারাপারে ডিঙি ও মাঝারি আকারের নৌকা ব্যবহার করতেন দুই পাড়ের মানুষ। মূলত করিমের ঘাট ও নবিউলের ঘাট নামে পরিচিত স্থানগুলোতে ইজারাদারের মাধ্যমে নৌকায় যাতায়াত চলত। পরবর্তীতে নদীর প্রশস্ততা কমে এলে স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে এই বাঁশের সাঁকোটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় দেড় বছর ধরে এই সাঁকোটিই ছিল হাজারো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রধান ভরসা।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে স্থানীয় উদ্যোগে সাঁকোটি মেরামত করা হতো। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় এর বাঁশের পাটাতন ও মূল কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, দুই থেকে তিন মাস আগে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়লে শুরু হয় সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ।
সাঁকোটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী, চরগোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, নাওডাঙ্গা ও শিমুলবাড়ী এলাকার হকবাজারসহ লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরখারুয়া ও খারুয়া গ্রামের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য বাজারে যাওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিনতি রানীকে মাথায় বাদামের বোঝা নিয়ে বুকসমান পানি মাড়িয়ে নদী পার হতে দেখা যায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “খালি ছবি তোলেন বাহে। দুই-তিন মাস ধরে এত কষ্ট করে নদী পারাপার হচ্ছি, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি। ছেলেমেয়েদেরও অনেক কষ্ট করে নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। আমরা আর এই দুর্ভোগ সহ্য করতে পারছি না। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত করা হোক।”
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী আকাশ মাহমুদ ও কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, এই পথটি দিয়ে এলাকার হাজারো মানুষ নিয়মিত নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট বাজারে যাতায়াত করেন। এছাড়া এলাকার দেড় থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বালারহাট আদর্শ স্কুল, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ফুলবাড়ী কলেজে পড়াশোনা করেন। সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় তাদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, শাকিব ও সবুজ মিয়া এবং কলেজশিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার ও মঈনুদ্দিন জানান, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় কখনো সাঁতরে, আবার কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা সাঁকো পার হতে হয়। পারাপারের সময় অনেকেই পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। তারা দ্রুত সাঁকোটি মেরামতের দাবি জানান।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় মৎস্য খামারি আতাউর রহমান রতন বলেন, বারোমাসিয়া নদীর ওপর এই সাঁকোটি দুই পাড়ের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। দুই থেকে তিন মাস আগে এটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে। অনেকে বুকসমান পানিতে নেমে পারাপার করছেন। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত অথবা টেকসইভাবে নতুন সাঁকো নির্মাণ করা প্রয়োজন।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ভেঙে যাওয়া সাঁকোটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এটি নির্মাণ করা হলে দুই পাড়ের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ কমবে।”
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে একটি টেকসই বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছি।”