রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ শাখায় এক কর্মকর্তার অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩২ টাকা আত্মসাতের ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. গালিব হাসান ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে মোট ৭১টি ভুয়া ঋণ হিসাব খুলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কম্পিউটার সিস্টেমে দুই কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে এই জালিয়াতি চালানো হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় এই গুরুতর অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর গালিব হাসানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ব্যাংকের ডিজিটাল সিস্টেমে ভুয়া ঋণ হিসাব তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠানের নতুন দুই জেনারেল অফিসার মো. আসিফ ও গালিব হোসেনের আইডি ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণত ব্যাংকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়। প্রথমে গ্রাহকের পরিচয় শনাক্তকরণ, আবেদনপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের যাচাই এবং ঋণের বিপরীতে জামানত বা বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্য নির্ধারণের মতো ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা থাকে। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতিতে কৌশলে এই জালিয়াতি করায় তাৎক্ষণিকভাবে শাখার অন্য কর্মকর্তাদের নজরে আসেনি বিষয়টি। পরে বিশেষ নিরীক্ষায় এই তথ্য বেরিয়ে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ শাখার একজন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘নতুন দুই কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে কম্পিউটার সিস্টেমে ভুয়া ঋণ হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর কোনো কাগজপত্র ছিল না। কৌশলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জালিয়াতি করা হয়েছে। অন্য কর্মকর্তারাও বুঝতে পারেননি। অভিযুক্ত গালিব জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছেন। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় অনিয়ম ধরা পড়লে গত অক্টোবরে শাখা কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে দেখা যায়, ৭১টি বানোয়াট ঋণ হিসাবের বিপরীতে কোনো বৈধ আবেদন নেই। এমনকি ভুয়া গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। নিয়ম উপেক্ষা করে কীভাবে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হলো, তা খতিয়ে দেখতে কর্তৃপক্ষ বিশেষ তদন্ত শুরু করে।
কৃষি ব্যাংকের সিলেটের মুখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান শহীর জানান, গালিব হাসান বছরখানেক ধরে এই ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে কার কী দায় রয়েছে, জানা যাবে। এর আগে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গালিব হাসান প্রাথমিক পর্যায়ে এসব জালিয়াতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা নিশ্চিত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ব্যাংকের সিলেট আঞ্চলিক মুখ্য কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তদন্ত সূত্র আরও জানিয়েছে, কমিটির কাছে গালিব হাসান জালিয়াতির কথা স্বীকার করলেও আত্মসাৎ করা অর্থ এখনো ব্যাংকে ফেরত আসেনি।
এই অভিযোগের বিষয়ে গালিব হাসানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’ এরপর বার্তা পাঠানোর অনুরোধ করলে তিনি উত্তরে লেখেন, ‘এসব উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু অভিযুক্ত গালিবকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে দায় শেষ হবে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও শনাক্ত করা হবে। সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন দুই কর্মকর্তার আইডি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তাদের অজান্তে এই কাজ হয়েছে কি না। কম্পিউটার সিস্টেমে লেনদেনের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষিত ছিল কি না এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংক অন্যের অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে, তাদের নিজস্ব অর্থ নয়। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নৈতিকতার মান অনেক উঁচুতে ধরে রাখা উচিত। তাদের নৈতিকতার স্খলন ঘটলে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। কোনো কর্মকর্তা এ ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকলে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি। কেননা, অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলবে না। তবে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।’