সিলেটে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পারিবারিক বিরোধ, জমি লিখে না দেওয়া এবং পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন একজন মা, এক যুবক এবং একজন বৃদ্ধ।
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাতে ওই উপজেলার দুপরিরপাড় গ্রামে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের হামলায় আক্তার হোসেন (৩০) ও জাহাঙ্গীর হোসেন (২৭) নামের দুই যুবক গুরুতর আহত হন। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আক্তার মারা যান। নিহত আক্তার ওই গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে। এই ঘটনায় জড়িত চাচাতো ভাই জুয়েল আহমদকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উছমান গণি জানান, “পুকুর থেকে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।”
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে বালাগঞ্জ উপজেলায়। ওই উপজেলার পূর্ব গৌরিপুর ইউনিয়নের মুসলিমাবাদ ডেকাপুর গ্রামে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আবুল মিয়া (৬৫) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে তার ভাইকেও দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আবুল মিয়া ও তার ভাই আব্দুল কাদির তাদের ভাতিজা টিটু মিয়ার কাছে জমি বিক্রির ১২ লাখ টাকা পাওনা ছিলেন। দীর্ঘ সময় টাকা চেয়েও তারা তা পাননি, অথচ পাওনা পরিশোধ না করেই টিটু ওই জমিতে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। রোববার রাতে পাওনা টাকা চাওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে টিটু ধারালো ছুরি দিয়ে চাচা আবুল মিয়ার বুকে আঘাত করেন। এসময় তিনি আরেক চাচা আব্দুল কাদিরকেও দা দিয়ে মাথায় ও হাতে কোপ দেন। পরে আবুল মিয়াকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযুক্ত টিটু মিয়া ওই বাড়িরই আব্দুল হক ফরিদ মিয়ার ছেলে।
বালাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ তরফদার বলেন, “সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিহতের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মরদেহ দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। অভিযুক্ত টিটু পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
তৃতীয় এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে জকিগঞ্জ পৌর এলাকায়। গত শনিবার পঙ্গবট গ্রামে জমি লিখে না দেওয়ায় ছেলের হামলায় গুরুতর আহত হন মা পিয়ারা বেগমসহ (৬৩) পরিবারের চার সদস্য। সোমবার ভোরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পিয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়। পিয়ারা বেগম ওই গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের স্ত্রী।
পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবি ও টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার সৎমা কুটিনা বেগমকে (৪৫) লাঠি দিয়ে আঘাত করে ছেলে সুমন আহমদ। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে পিয়ারা বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা গুরুতর আহত হন। তাদের প্রথমে জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পিয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় সুমনের বড় ভাই শাহীন আহমদ বাদী হয়ে সুমন আহমদসহ দুজনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলার বাদী শাহীন আহমদ জানান, হামলায় আহতদের মধ্যে তার স্ত্রী শাহানা বেগম ও মেয়ে ইসরাত জাহানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সৎমা কুটিনা বেগমের চোখের জখমও গুরুতর এবং তিনি নিজেও মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত ছেলে সুমন আহমদকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার তাকে জকিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম সরকারের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ছেলের হামলায় আহত পিয়ারা বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুমন আহমদকে তার বসতঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য সুমন কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। এ বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। সুমনের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।”