বোলারদের দুর্দান্ত নৈপুণ্য সত্ত্বেও ব্যাটারদের চরম ব্যর্থতায় যুব এশিয়া কাপের শুরুতেই দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হলো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ১১৩ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট অভিযান শুরু করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ওমানের আল আমেরাত ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের ‘বি’ গ্রুপের এই লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় দুই দেশ। টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান। নির্ধারিত ৫০ ওভারের এক ওভার বাকি থাকতেই ২৩১ রানে অলআউট হয় তারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ২৫ ওভার ৫ বলে ১১৮ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।

২৩২ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যুবা টাইগাররা। দ্বিতীয় ওভারেই মাত্র ৬ রান করে আমির হামজার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার আবদুল্লাহ আল মুহি। তখন দলের সংগ্রহ ছিল মাত্র ৭ রান।

পঞ্চম ওভারে নূর আলী নিয়াজাইয়ের জোড়া আঘাতে আরও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথমে আলামিন হোসেন রনিকে এলবিডব্লিউ করার পর ওই ওভারের শেষ বলে আহসান আল মুমিনকে উইকেটরক্ষকের ক্যাচ ধরান তিনি। আলামিন করেন ৬ রান, তবে মুমিন রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন। ফলে ২০ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

দলকে এই সংকট থেকে টেনে তোলার দায়িত্ব ছিল অধিনায়ক ফরিদ হাসান ফয়সালের কাঁধে। কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন। অষ্টম ওভারের প্রথম বলে মাত্র ১ রান করে আমির হামজার বলে বোল্ড হন অধিনায়ক। ঠিক তার পরের বলেই শূন্য রানে এলবিডব্লিউ হন আল রাফি। মাত্র ২৬ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

এরপর রাকিবুল হোসেনকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন ওপেনার এসকে জারিফ সিয়াম। তবে সেই প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একাদশ ওভারের প্রথম বলে ৭ রান করে সাজঘরে ফেরেন রাকিবুল। তখন ৬ উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল মাত্র ৪১ রান।

এমন চরম বিপর্যয়ের মাঝে সপ্তম উইকেটে কিছুটা লড়াই দেখান জারিফ সিয়াম ও রবিউল হাসান অনিক। এই জুটি মিলে ৫৫ রান যোগ করেন। তবে লক্ষ্য অনেক দূরে থাকায় এই জুটি জয়ের সম্ভাবনা আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

২২তম ওভারে সামি মুবারেজের বলে বোল্ড হয়ে এই জুটি ভেঙে যায়। আউট হওয়ার আগে ৪৭ বলে ৩৩ রান করেন অনিক, যার মধ্যে ছিল চারটি চার ও একটি ছক্কা। দলীয় ৯৬ রানে সপ্তম উইকেট পতনের পর আবারও ব্যাটিং ধস নামে।

এরপর মাত্র দুই রান যোগ হতেই সোহাইল খানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন দলের সর্বোচ্চ সংগ্রাহক জারিফ সিয়াম। ৫৮ বলে ছয়টি চারের সাহায্যে তিনি করেন ৪১ রান। পরের ওভারেই শূন্য রানে আউট হন শেখ আতিকুর রহমান। ফলে ৯৯ রানেই নবম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

শেষদিকে রুবায় ইসলাম রিজনের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে একশ রানের গণ্ডি পার করে যুবা টাইগাররা। তিনি মাত্র ১৪ বলে তিনটি চার ও একটি ছক্কায় ২১ রান করেন। তবে তার বিদায়ের সঙ্গেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। ২৫.৫ ওভারে ১১৮ রানে অলআউট হয় ফরিদ হাসানের দল। শেষ চার উইকেট হারাতে বাংলাদেশ মাত্র ২২ রান যোগ করতে পেরেছে।

আফগানিস্তানের হয়ে বল হাতে দাপট দেখান তিন বোলার। আমির হামজা ৬ ওভারে ২৩ রান দিয়ে তিন উইকেট নেন। নূর আলী নিয়াজাই সমান ওভারে ২৯ রানে এবং সামি মুবারেজ মাত্র ২.৫ ওভারে ১১ রানে তিনটি করে উইকেট শিকার করেন। বাকি উইকেটটি নেন অধিনায়ক সোহাইল খান।

এর আগে ব্যাটিংয়ে নেমে আফগানিস্তানও শুরুতে বেশ চাপে ছিল। বাংলাদেশের বোলারদের আক্রমণাত্মক বোলিংয়ে মাত্র ৫৮ রানেই চার উইকেট হারায় তারা। তখন মনে করা হচ্ছিল অল্প রানেই প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দেবে বাংলাদেশ।

তবে পঞ্চম উইকেটে শাহ ফয়সাল রহিমি ও তাহির সারওয়ারির ৫৯ রানের জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৪৩ বলে চারটি চার ও দুটি ছক্কায় ৩৭ রান করেন সারওয়ারি। রবিউল হাসান অনিকের বলে আহসান আল মুমিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট হন।

অন্যদিকে একপ্রান্ত আগলে রেখে ইনিংস বড় করতে থাকেন রহিমি। বাংলাদেশের বোলারদের সামলে দলের সংগ্রহ দুইশ পার করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৯৭ বলে আটটি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে ৮৩ রান করে আউট হন এই ব্যাটার। তার এই ইনিংসই আফগানদের জন্য লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেয়।

রহিমিকে বোল্ড করে ফেরান তাফিউল আলম তামিম। এর আগে সুবহান জাখাইল ও আবিদুল্লাহ নাদারজানকেও সাজঘরে পাঠিয়েছিলেন তিনি। শেষদিকে নূর আলী নিয়াজাইকে বোল্ড করে নিজের চতুর্থ উইকেটটি তুলে নেন এই পেসার।

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাফিউল। ১০ ওভারে ৪১ রান খরচ করে চার উইকেট নেন তিনি। রবিউল হাসান অনিক ৪৫ রানে দুটি উইকেট পান। এছাড়া শেখ আতিকুর রহমান, রুবায় ইসলাম রিজন ও আল রাফি একটি করে উইকেট নেন। অন্য উইকেটটি আসে রানআউট থেকে।

শেষদিকে আফগানিস্তানের ইনিংসে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফেরায় বাংলাদেশ। ২২০ রানে অষ্টম উইকেট পতনের পর বাকি দুই উইকেট তুলতে মাত্র ১১ রান খরচ করে তারা। ফলে ৪৯ ওভারে ২৩১ রানেই থামে আফগানিস্তানের ইনিংস।

উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে চার ম্যাচের যুব ওয়ানডে সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ, যা ২-২ সমতায় শেষ হয়েছিল। তবে এশিয়া কাপের মঞ্চে আফগান বোলারদের সামনে অসহায় হয়ে পড়ল বাংলাদেশের ব্যাটাররা।

এই হারের ফলে গ্রুপ পর্বের শুরুতেই চাপে পড়ে গেল যুবা টাইগাররা। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের অন্য দুই প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়া। আগামী শনিবার (৭ নভেম্বর) শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ এবং ৯ নভেম্বর মালয়েশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।