পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদার কথা বিবেচনা করে ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে নবগঠিত মজুরি বোর্ডের কাছে ১৫টি দাবি পেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই দাবিগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে যে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সে শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”

মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত সেক্রেটারি অভিযোগ করেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেখানে জাতীয় শ্রমিক দলের নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের শ্রমিকসংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কাউকে এই বোর্ডে রাখা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নায়েবে আমির মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুর রব, মো. শাহাবুদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।

জামায়াতের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা ও নিহত শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। এছাড়া কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

দাবির তালিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধিসহ এই খাতের সকল অংশীজনদের অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ বা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিরোধ করার দাবি জানানো হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো দ্রুত খুলে দিয়ে শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।

বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা এবং কালোতালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করার দাবি জানানো হয়েছে। নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।