যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া ওয়াশিংটনের বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের দাবি, বর্তমানে ইসরায়েলের আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন চলাকালীন ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, এই অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর একটি চুক্তি হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই মিত্রদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে ওয়াশিংটন পাশে দাঁড়াবে।
ইসরায়েলের একজন কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখে এমন বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই সহায়তা বন্ধের প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক সহায়তা চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।
গাজা যুদ্ধের পর মার্কিন নাগরিকদের, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এই মন্তব্য করলেন। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির একটি জরিপ অনুযায়ী, ৪৮ শতাংশ ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন প্রদান করছে। ২০১৭ সালে যখন প্রথমবার এই প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন এই হার ছিল যথাক্রমে মাত্র ১৬ ও ২০ শতাংশ।
কেন এই সহায়তা কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের মতে, ইসরায়েলকে দেওয়া এই সহায়তা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি ‘রাজনৈতিকভাবে সমালোচনার হাতিয়ার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি মিশিগান থেকে নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর আবদুল আল-সাইদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। আল-সাইদ সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে জয়লাভ করে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস গড়েছেন।
ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, “যখন তাদের এ অর্থের প্রয়োজনই নেই, তখন আল-সাইদের মতো “উন্মাদের” কথায় আমরা কেন ভুগব?” তিনি আরও যুক্তি দেন যে, মার্কিন অর্থায়ন ছাড়াই চলার মতো ইসরায়েল যথেষ্ট সমৃদ্ধিশালী।
নির্বাচনের দিনই এই ঘোষণা দেওয়ার পেছনে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ডেমোক্র্যাটরা যেন এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করে রিপাবলিকানদের আক্রমণ করতে না পারেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু নিজেই এই সহায়তা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এর আগে হঠাৎ বন্ধ না করে, আগামী এক দশকে পর্যায়ক্রমে এই সহায়তা কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষই এখন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ইসরায়েলের জন্য নতুন কোনো সহায়তা পাস করা এমনিতেও বেশ কঠিন হবে।
ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা পেয়েছে এবং এখনো পাচ্ছে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)।
ওই স্মারকের আওতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে মোট ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবছর ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ (এফএমএফ) বাবদ ৩৩০ কোটি ডলার এবং যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য ৫০ কোটি ডলার দেওয়া হয়, যা বছরে মোট ৩৮০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
এই কাঠামোর বাইরেও বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলকে বাড়তি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি কোনো নগদ অর্থ সাহায্য নয়। এফএমএফ-এর অধীনে ইসরায়েল এই মার্কিন অর্থ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনে এবং সেবা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ফলে এই ব্যবস্থার সরাসরি সুবিধাভোগী হয়ে থাকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতারা।
সহায়তা কমালে ইসরায়েলের পরিস্থিতি কী হবে?
মার্কিন সহায়তাকে চিরস্থায়ী ধরে নেওয়া যায় না, তা নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছেন। গত জানুয়ারিতে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আগামী দশকে তিনি মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চান। কারণ, এই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত শর্তাবলির কারণে তাঁকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মতামতের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে তিনি যদি পুনরায় ক্ষমতায় আসেন এবং গাজায় হামলা অব্যাহত রাখেন, তবে এই দুর্বলতা আরও প্রকট হবে।
তবে হঠাৎ করে এই সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়া হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতারা ইতিমধ্যেই নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।
নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের বিশেষ সম্পর্ক আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৌশলগত সম্পর্কের কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টি ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থা ও জনগণ সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছেন। এতে বোঝা যায়, নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড কতটা প্রকৃত হুমকি তৈরি করছে। তাঁর ওপর আর নির্ভর করা যায় না। তাঁকে অবশ্যই সরাতে হবে।”
ইসরায়েলের ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “যখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, যখন দেশের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুত নতুন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে—তখন নেতানিয়াহুর ঝুলিতে যুক্ত হলো আরও একটি বিরাট ব্যর্থতা। মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়া ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর এক মারাত্মক আঘাত..।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর সময়ে এল, যখন তিনি পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা মেলাতে মরিয়া হয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম বড় শক্তির জায়গা।
সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নাম প্রকাশ না করে শীর্ষস্থানীয় একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার কথা তুলে ধরেছে। তিনি বলেছেন, এই ঘোষণার কারণে অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, “দুই বছরের সহায়তা ছেড়ে দেওয়ার মানে হলো ৮০০ কোটি ডলার হারানো। আমরা এ অর্থ কোথায় পাব? এটা পরিষ্কার, নাগরিকদের করের অর্থ থেকে সহায়তা নিতে হবে।”
তবে শুধু একটি ঘোষণার মাধ্যমেই ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে এবং প্রতিবছর এই তহবিল বরাদ্দের মূল ক্ষমতা মার্কিন কংগ্রেসের হাতে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা কমিয়ে আনা। এর বিকল্প হিসেবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্র তৈরিতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার পথ খোঁজা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, ইসরায়েল যদি নিজের চেষ্টায় আরও বড় এবং উন্নত বোমা তৈরির প্রযুক্তি পেয়ে যায়, তবে তা মোটেও ভালো কোনো ফল আনবে না।