দল জয়লাভ করলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে যেন দিশেহারা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লড়াইয়ে এইকে এথেন্সের মুখোমুখি হয়ে দুইবার পিছিয়ে পড়ার পর নাটকীয়ভাবে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে এই জয়ের আনন্দ থাকলেও প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস। পুরো ম্যাচে মাত্র একবার ড্রিবলের চেষ্টা করলেও তাতে সফল হতে পারেননি তিনি। গোল কিংবা অ্যাসিস্ট ছাড়া মাঠ ছাড়ার ধারা অব্যাহত রেখে টানা ষষ্ঠ ম্যাচ শেষ করলেন তিনি।
তবে এই কঠিন সময়েও শিষ্যের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন কোচ হোসে মরিনহো। তার দৃষ্টিতে ভিনিসিয়ুসের পারফরম্যান্স ছিল ‘গ্রহণযোগ্য’। যদিও পরিসংখ্যানের পাতা বলছে ভিন্ন কথা; রিয়ালের সাত নম্বর জার্সিধারী তার চেনা ছন্দ থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে গ্রিসের অলউইন অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের ম্যাচে এইকে এথেন্সকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে রিয়াল মাদ্রিদ। জুড বেলিংহাম এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলে দুইবার সমতায় ফেরার পর অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেদেরিকো ভালভার্দে। তবে ম্যাচের ৮১তম মিনিটে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার আগে আক্রমণভাগে বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি ভিনিসিয়ুস।
ম্যাচের আগের দিনই পর্তুগিজ কোচ মরিনহো নিশ্চিত করেছিলেন যে, এথেন্সে ভিনিসিয়ুসকে একাদশে রাখা হবে। নিজের এই সিদ্ধান্তে কোনো দ্বিধা ছিল না তার। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান তারকা। এক সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্কের নাম হওয়া ভিনিসিয়ুস এখন ডিফেন্ডারদের চ্যালেঞ্জ জানাতে আগের মতো সক্রিয় নন।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইকের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে ভিনিসিয়ুস মাত্র একটি ড্রিবলের চেষ্টা করেন, যা ব্যর্থ হয়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টানা তিন ম্যাচে কোনো সফল ড্রিবল করতে পারেননি তিনি। এর আগের দুই ম্যাচে রোমা ও আরবি লাইপজিগের বিপক্ষে তিনি একবারও ড্রিবলের চেষ্টা করেননি।
প্রতিপক্ষ রক্ষণকে কাটিয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়াই ছিল ভিনিসিয়ুসের প্রধান অস্ত্র। কিন্তু বর্তমানে সেই দক্ষতায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে রিয়ালের এই ফরোয়ার্ডের খেলায়।
চলতি মৌসুমে লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৩.৯৮টি ড্রিবলের চেষ্টা করছেন ভিনিসিয়ুস, যার মধ্যে সফল হয়েছেন মাত্র ১.৬৩টিতে। এর বিপরীতে ২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রতি ৯০ মিনিটে ৮.৩৬টি ড্রিবলের চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন ৩.২৭টিতে। অর্থাৎ সফল ড্রিবলের সংখ্যা কমার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
এইকের বিপক্ষে তার অন্যান্য পরিসংখ্যানও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। মাঠে থাকাকালীন তিনি মাত্র ৪৮ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া বাদে রিয়ালের শুরুর একাদশের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাতটি দ্বৈরথের মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র দুটিতে। ১১ বার বলের দখল হারিয়েছেন এবং তিনটি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি।
তবে আক্রমণে তিনি পুরোপুরি নিষ্প্রভ ছিলেন না। সতীর্থদের জন্য দুটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন তিনি। বিশেষ করে পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে এমবাপ্পেকে দেওয়া একটি পাস ছিল নজরকাড়া। তবে তার সামর্থ্য ও অতীতের পারফরম্যান্সের তুলনায় একে যথেষ্ট বলা যায় না।
অন্যদিকে, একই ম্যাচে ডান প্রান্তে খেলতে নেমে সাতটি ড্রিবলের চেষ্টা করে চারটিতে সফল হয়েছেন ইয়ান দিয়োমান্দে। আইভরিকোস্টের এই তরুণ উইঙ্গারকে ৬৭তম মিনিটে তুলে ভালভার্দেকে মাঠে নামান মরিনহো। অথচ নিজের পছন্দের বাঁ প্রান্তে দীর্ঘক্ষণ খেলেও একটি সফল ড্রিবল করতে পারেননি ভিনিসিয়ুস।
তা সত্ত্বেও শিষ্যের সমালোচনা করতে রাজি হননি মরিনহো। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ভিনিসিয়ুসের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ভিনিসিয়ুস গ্রহণযোগ্য একটি ম্যাচ খেলেছে। অসাধারণ কিছু নয়, তবে দলও অসাধারণ খেলেনি। কঠিন একটি ম্যাচ ছিল এবং সেই বিবেচনায় সে নিজের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছে।’
ভিনিসিয়ুসের কারণে দিয়োমান্দেকে ডান প্রান্তে খেলতে হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াল কোচ বলেন, ‘ভিনিসিয়ুস কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। দিয়োমান্দেকে রিয়ালে আনা হয়েছে দুই প্রান্তেই খেলার সামর্থ্যের কারণে। সে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রান্তের খেলোয়াড় নয়। ডানে কিংবা বাঁয়ে খেলতে তার কোনো সমস্যা নেই।’
ম্যাচের ৮১তম মিনিটে ভিনিসিয়ুসের পরিবর্তে আলভারো কারেরাস এবং হলুদ কার্ড পাওয়া মার্ক কুকুরেয়ার বদলে ব্রাহিম দিয়াজকে মাঠে নামান মরিনহো। এই পরিবর্তনের পেছনে ম্যাচের পরিস্থিতির পাশাপাশি পরবর্তী ম্যাচের পরিকল্পনাও ছিল বলে জানান তিনি।
মরিনহোর ভাষায়, ‘এমন অনিশ্চিত ম্যাচে পরিবর্তন আনার সময় আমাকে ফলাফলের কথা ভাবতে হয়। একই সঙ্গে শনিবার ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের কথাও মাথায় রাখতে হয়েছে। কিছু পরিবর্তনের সময় সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি।’
কোচ আরও জানান, ভিনিসিয়ুস কিছুটা ক্লান্ত ছিলেন এবং হলুদ কার্ড পাওয়া কুকুরেয়াকে রেখে ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। শেষ দিকে কারেরাস ও ব্রাহিমের প্রবেশ আক্রমণে নতুন গতি আনে, যার ফলে ভালভার্দের জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট করেন ব্রাহিম।
তবে ভিনিসিয়ুসের এই সমস্যা কেবল এইকের ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১২ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা মাত্র একটি এবং তিনটি অ্যাসিস্ট। আগস্টে রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে গোল করার পর থেকে আর প্রতিপক্ষের জাল স্পর্শ করতে পারেননি তিনি।
এএসের হিসাব অনুযায়ী, শেষ ছয় ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন ভিনিসিয়ুস। ২০২২-২৩ মৌসুমের পর এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় সরাসরি কোনো গোলে অবদান রাখতে পারেননি তিনি।
এর পাশাপাশি লা লিগায় নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়মিত খেলতে পারছেন না এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। গত ১০ অক্টোবর ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে প্রতিপক্ষের নাথান সালিবার চুল টেনে লাল কার্ড দেখেন তিনি। এরপর রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রতিবাদ করায় শাস্তির মেয়াদ আরও বৃদ্ধি পায়।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন এই দুই ঘটনায় মোট চার ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয় ভিনিসিয়ুসকে, যা রিয়াল মাদ্রিদের আপিল করার পরও বহাল থাকে। আগামী শনিবার (৭ নভেম্বর) ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তাকে এই নিষেধাজ্ঞার শেষ ধাপ কাটাতে হবে। ফলে বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন্স লিগই তার জন্য নিজেকে প্রমাণের প্রধান মঞ্চ।
ভিনিসিয়ুসকে সামলানোর কৌশল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মরিনহো মজার জবাব দেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসতে হাসতে রিয়াল কোচ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ওর ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নরম আর ২০ শতাংশ কঠোর পদ্ধতি ব্যবহার করছি।’
মরিনহোর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, কঠিন সময়েও তিনি ভিনিসিয়ুসকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে সেই সমর্থনের পাশাপাশি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে আরও কার্যকর পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করছেন তিনি।
দলের সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে চিন্তিত নয় রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম চার ম্যাচে জিতে পূর্ণ ১২ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে মরিনহোর দল। এথেন্সেও প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় নিশ্চিত করেছে তারা।
তবে দলের এই সাফল্যের আড়ালে ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত ফর্ম এখন বড় প্রশ্ন। এক সময় একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা এই তারকা এখন গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ড্রিবল—কোনোটিই করতে পারছেন না। মরিনহো তাকে আস্থা দিলেও, সেই আস্থার প্রতিদান দিতে হলে ভিনিসিয়ুসকে দ্রুতই মাঠের লড়াইয়ে ফিরতে হবে তার চেনা ছন্দে।