পৃথিবীতে অসংখ্য ‘ষড়যন্ত্র–তত্ত্ব’ প্রচলিত রয়েছে। কেনেডি হত্যাকাণ্ড, ভিনগ্রহবাসীদের অস্তিত্ব, ইলুমিনাতি কিংবা গ্রিফন শকুন—চাইলে এমন আরও অনেক ‘ষড়যন্ত্র–তত্ত্বে’র কথা বলা যায়। গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ব্রাজিলেও ঠিক এমনই এক অদ্ভুত ষড়যন্ত্র–তত্ত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল; প্রশ্ন উঠেছিল—এই ভিনিসিয়ুস আসল, না নকল!
আসল ঘটনাটি ছিল এই যে, বিশ্বকাপের পর ভিনিসিয়ুস তাঁর মুখের কসমেটিক সার্জারি করান। এর ফলে তাঁর চেহারার গড়নে কিছুটা পরিবর্তন আসে। কিন্তু ষড়যন্ত্র–তত্ত্বে বিশ্বাসীরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ব্রাজিলজুড়ে এক অবিশ্বাস্য দাবি ছড়িয়ে পড়ে—ভিনিসিয়ুস রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন এবং তাঁর বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের চুক্তিগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য অবিকল তাঁর মতো দেখতে অন্য একজনকে মাঠে নামানো হচ্ছে!
সেই সময়ে এই ষড়যন্ত্র–তত্ত্বটি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তবে চলতি মৌসুমে মাঠে ভিনির যে পারফরম্যান্স, তাতে মনে হচ্ছে এই তত্ত্বটি এবার হয়তো ভিত্তি পেতে পারে। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, রিয়াল মাদ্রিদে গত আট মৌসুম ধরে যে ভিনিসিয়ুসকে দেখা গেছে, বর্তমান ভিনির সঙ্গে তাঁর কোনো মিল নেই।
২০২৬–২৭ মৌসুমে এখন পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে ১০টি ম্যাচে মাত্র ১টি গোল করেছেন তিনি। এর মধ্যে ৮টি ম্যাচ ছিল লা লিগায়, যেখানে তিনি ১টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করেছেন। অন্যদিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের ২ ম্যাচে তাঁর কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট নেই। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর থেকে ভিনিসিয়ুসের জন্য এটাই সবচেয়ে বাজে শুরু।
সাধারণত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সাফল্যের মাপকাঠি হয় গোল ও অ্যাসিস্ট। এই ফলাফল কেমন হবে তা নির্ভর করে খেলোয়াড়ের খেলার ধারার ওপর। যেমন উইংয়ে খেলা ভিনির জন্য ড্রিবলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। ড্রিবলিং ভালো হলে বোঝা যায় ভিনি ফর্মে আছেন, কিন্তু এবার সেটিও আশানুরূপ হচ্ছে না।
শুধুমাত্র লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচগুলো বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০২২–২৩ মৌসুমে প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৮.৪২টি ড্রিবলিং করেছিলেন ভিনি, যার গড় সফলতা ছিল ৩.৬৭। তবে এই মৌসুম থেকে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মৌসুমে ৯০ মিনিটে ভিনির ড্রিবলিংয়ের হার ক্রমাগত কমছে।
২০২৩–২৪ মৌসুমে প্রতি ৯০ মিনিটে ৭.৩৭টি ড্রিবলিংয়ের মধ্যে তাঁর সফলতা ছিল ৩.১৫টি। ২০২৪–২৫ মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় গড়ে ৬.৭০টি ড্রিবলিংয়ে ২.৮২টি সফলতা। গত মৌসুমে এই হার ছিল গড়ে ৫.৫১টিতে ২.৫৩ এবং এবার তা নেমে এসেছে গড়ে ৪.৩৪টি ড্রিবলে মাত্র ১.৮৬টি সফলতায়।
গোল করার ক্ষেত্রে শট নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। এই মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৫টি শট নিয়েছেন ভিনি, যার মধ্যে গোল হয়েছে মাত্র একটি। অথচ তাঁর সুযোগগুলোর প্রত্যাশিত গোলের (এক্সজি) সংখ্যা ছিল ৩.১৪—সেখান থেকে মাত্র একটি গোল করা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই পরিসংখ্যানে তাঁর শট থেকে গোল পাওয়ার হার অত্যন্ত হতাশাজনক; যা মাত্র ৪.৪ শতাংশ।
এর অর্থ হলো, প্রতি ১০০টি শটে তিনি চারটিরও কম গোল করতে পারছেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ২০টির বেশি শট নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে এই হার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
নিজের এই ফর্মের কারণে ভিনিসিয়ুস নিজেই বিরক্ত। গত বৃহস্পতিবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগে রোমার বিপক্ষে ৪–৩ গোলে রিয়ালের জয়ের ম্যাচে ৫৯ মিনিটে তাঁকে তুলে নেন কোচ জোসে মরিনিও। রিয়ালে এই মৌসুমে সেটাই ছিল ভিনির সর্বশেষ ম্যাচ। কোচ জোসে মরিনিও তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ গোল তো দূরে থাক, তিনি কোনো অ্যাসিস্ট করতে পারেননি, পোস্টে শট মারেননি, এমনকি বিপদ তৈরি করার মতো কোনো পাসও দিতে পারেননি। প্রতিটি ড্রিবলিংয়েই তিনি আটকে যাচ্ছিলেন। ম্যাচ শেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সেরা ফর্মে না থাকায় আমি নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত।”
তবে এই বিরক্তি যদি মরিনিওর ওপর প্রভাব ফেলে, তবে তা সমস্যার কারণ হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি এবং রিয়াল কোচ ভিনির ওপর আস্থা রাখছেন। তবে পরিস্থিতি যে ভিন্ন হতে পারে, তার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
রোমা ম্যাচে ভিনির পরিবর্তে এনদ্রিককে খেলিয়ে তাঁর কাছ থেকে একটি গোল ও অ্যাসিস্ট পেয়েছেন মরিনিও। ওই ম্যাচের আগেই এনদ্রিকের ওপর ভরসা রাখার কথা স্পষ্ট করেছিলেন কোচ। অন্যদিকে গতকাল লা লিগায় সেভিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলা ইয়ান দিওমান্দেও ভিনির ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। আইভরি কোস্টের এই উইঙ্গার রিয়ালের সর্বশেষ চারটি ম্যাচেই গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন। তিনি উভয় উইংয়েই খেলতে সক্ষম।
লিগে চার ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ায় ভিনির জায়গায় (বাঁ উইং) সেভিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার মাঠে নেমে দারুণ খেলেছেন দিওমান্দে। সামনে ‘এল ক্লাসিকো’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্রাজিলিয়ান তারকাকে এই ম্যাচে পাবে না রিয়াল। দিওমান্দে যদি ক্লাসিকোতেও ভালো খেলেন, তবে ভিনির ওপর চাপ আরও বাড়বে। একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য নতুন কারও সঙ্গে লড়াই করা ভিনির জন্য মোটেও সুখবর হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা এমনই। গত মৌসুমে রিয়ালের হয়ে প্রতি ম্যাচে গড়ে ০.৬ গোলে অবদান ছিল ভিনির, যেখানে তাঁর মোট গোল ছিল ২২টি এবং অ্যাসিস্ট ১০টি। এ মৌসুমে তা নেমে ০.৪-এ দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ড্রিবলিংয়ের হিসেবেও এখন দিওমান্দের পেছনে ভিনি। রিয়ালে নিজের প্রথম মৌসুমে ২৩টি ড্রিবলিংয়ে দিওমান্দের সফলতার হার ৬৫.৭ শতাংশ, যেখানে ভিনির ১৪টি ড্রিবলিংয়ে সফলতা মাত্র ৪৬.৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, এই ভিনি আর আগের ভিনি নেই। মনে হচ্ছে যেন তাঁর রক্তমাংসের শরীরে ঢুকে বসে আছেন অন্য কেউ! এখন প্রশ্ন হলো, কে ফিরিয়ে আনতে পারেন সেই আগের ভিনিকে?
ভিনি নিজে ছাড়া আর কে!