চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জোসে মরিনিও এক অপ্রত্যাশিত ও আবেগঘন উপহার পেয়েছেন। গতকাল এই ম্যাচের প্রস্তুতি ঘোষণা করতে গিয়ে তিনি ইন্টার মিলানের সাবেক কোচ হিসেবে তার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। মরিনিও বলেন, ‘এটা আমার জন্য সাধারণ কোনো ম্যাচ নয়। ইন্টার যদি আমাকে বন্ধু মনে করেও থাকে, তবে তা হবে ম্যাচের আগে ও পরে। ম্যাচের সময় তারা আমাকে নিয়ে এমনটা ভাববে বলে মনে হয় না।’
চ্যাম্পিয়নস লিগের এই মুখোমুখি লড়াইয়ে দুই দলের মধ্যে পুরনো বন্ধুত্ব বা শত্রুতা ৯০ মিনিটের খেলায় প্রাধান্য হারায়। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আজ রিয়াল মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানের ম্যাচে ইতালিয়ান ক্লাবটি মরিনিওকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখবে। কিন্তু ইতালিয়ান ফুটবলের খ্যাতিমান সাংবাদিক তানক্রেদি পালমেরি সেই নিয়মের বাইরে গিয়ে একটি ব্যতিক্রমী কাজ করেছেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি মরিনিওকে ইন্টার মিলানের রঙে রাঙানো একটি ওয়াটার স্প্রিংকলার (পানি ছিটানোর যন্ত্র) উপহার দিয়েছেন।
এই উপহারটির পেছনে রয়েছে ২০১০ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বার্সেলোনার মাঠ ক্যাম্প ন্যুতে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের ফিরতি লেগের সেই ম্যাচে বার্সা ১–০ গোলে জিতলেও দুই লেগ মিলিয়ে মরিনিওর ইন্টারের কাছে ৩–২ গোলে হেরে কাতালান ক্লাবটি বিদায় নিয়েছিল। ম্যাচ শেষে তর্জনী তুলে ক্যাম্প ন্যুর মাঠে দৌড়ে জয় উদ্যাপন করেন মরিনিও। তখন ক্যাম্প ন্যুতে পানি ছিটানোর যন্ত্র ছেড়ে দেওয়া হয়। মরিনিও তার মধ্য ভিজেই সেই পাগলাটে দৌড়ে জয় উদ্যাপন করেন।
ইতালিয়ান ক্লাবটির সমর্থকদের কাছে সেই স্মৃতি অমূল্য। কারণ, মরিনিওর হাত ধরে সেবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল ইন্টার। শুধু তা–ই নয়, ইতালিয়ান ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে একমাত্র ‘ট্রেবল’জয়ী কোচ হিসেবে মরিনিওর নামটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে যায়। সেই মরিনিও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর ইন্টার ছেড়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন রিয়ালের। ১৬ বছর পর মরিনিও যখন রিয়ালে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযান শুরু করছেন, তখন তাঁর পথে প্রথম বাধাও সেই ইন্টার। তানক্রেদি এমন এক মুহূর্তকেই মরিনিওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উপলক্ষ হিসেবে বেছে নেন।
রেডিও মার্কার অনুষ্ঠান ‘ওত্রা রন্দা’য় মরিনিওকে উপহারটি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন পালমেরি। তাঁর ভাষায়, ‘পরিকল্পনা করেই কাজটা করা। আমার ঘরে কোনো ওয়াটার স্প্রিংকলার ছিল না, তাই আগে সেটা জোগাড় করতে হয়েছে। এরপর ইন্টার মিলানের জার্সির আদলে সেখানে কালো ও নীল রঙের দুটি স্ট্রাইপ আঁকতে হয়েছে।’
পালমেরি জানেন, সংবাদ সম্মেলনের বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে গিয়ে মরিনিওকে উপহার দেওয়ার কাজটি তিনি করেছেন। সে কথা তিনি স্বীকারও করলেন, ‘আমি জানি এমনটা সচরাচর করা হয় না এবং আমি সীমা কিছুটা লঙ্ঘন করেছি।’
তবে এ নিয়ে পালমেরির কোনো অনুশোচনা নেই। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় ইন্টারকে মরিনিওর মুখোমুখি দেখতে তিনি ১৬ বছর অপেক্ষা করেছেন। এবার সেই সুযোগটা পেয়েই পালমেরি বলেন, ‘এটি ছিল একধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শুভকামনা।’
তবে পালমেরি শুধু শ্রদ্ধা জানাতে মরিনিওকে এই উপহার দেননি। শুনুন স্পোর্তইতালিয়ার এই সাংবাদিকের মুখেই, ‘সেই রাতে মরিনিও যা করেছিলেন, তা আমার এক আত্মীয়ের মুখে একচিলতে হাসি ফুটিয়েছিল। একজন বাবা তাঁর জীবনে চরমতম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।’
পালমেরি জানান, সেই মানুষটি তাঁর অত্যন্ত কাছের। জীবনের চরম এক দুঃসময়ে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে ইন্টারের সেই ঐতিহাসিক জয় অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও সেই মানুষের মুখে হারিয়ে যাওয়া হাসি ফিরিয়ে এনেছিল। পালমেরি বলেন, ‘আমি সব সময়ই ভাবতাম, সুযোগ পেলেই জোসেকে এভাবে শ্রদ্ধা জানাব।’
তবে মরিনিওর কাছে এই উপহারের পেছনের মূল রহস্য খুলে বলার সুযোগ পাননি বলে স্বীকার করেন পালমেরি, ‘তাঁকে গুছিয়ে বিষয়টি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।’
মরিনিওর মতো একজন ব্যক্তিত্বের জন্য উপযুক্ত উপহার খুঁজে পাওয়াও ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। মার্কার সেই অনুষ্ঠানে পালমেরি বলেন, ‘যার সবই আছে, যিনি চাইলেই যেকোনো কিছু কিনে নিতে পারেন, তেমন একজন মানুষকে আপনি কী উপহার দেবেন?’
সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে আসে ওই স্প্রিংকলার। বিষয়টি কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও ইতালিয়ান ফুটবল এবং বিশেষ করে পালমেরির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এর অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর ভাষায়, ‘হঠাৎ করেই স্প্রিংকলারের কথা মাথায় আসে, তারপর তো ঘটনাটি ঘটেই গেল।’