মেধাবী তরুণদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা কমাতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। তাঁর মতে, মেধাবীদের দেশত্যাগের এই মিছিল থামাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানকেই গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত ৬টা ১২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এক পোস্টে এসব কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ লিখেছেন, ‘স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার পর একবার এক তরুণের বাঁধভাঙা উল্লাস ও আনন্দ-চিৎকার আমাকে ভিন্ন এক ভাবনায় আক্রান্ত করেছিল। তরুণের সেই উল্লাস আমাকে নতুন এক সমাজ-জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এটা কি জ্ঞানপিপাসু হিসেবে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে দেশ, জাতি ও উম্মাহকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাওয়ার আনন্দ নাকি উন্নত জীবনের মোহনীয় হাতছানি এবং আজীবন সেখানে স্থায়ী হওয়ার দুয়ার খুলে যাওয়ার আনন্দ?’
তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং সেখানেই নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য স্টুডেন্ট ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি ভিসা প্রদান করে থাকে। পর্যটন ভিসার তুলনায় স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ এবং কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি।
শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ থাকলেও এর পেছনে একটি গভীর সমীকরণ কাজ করছে বলে মনে করেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবার কারণে অনেক উন্নত দেশের জনসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কমতে থাকা জন্মের হার রীতিমতো জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রণোদনা দিয়েও তারা জন্মহার বাড়াতে পারছে না। তাদের প্রয়োজন আমাদের মতো গরিব দেশের মেধাবী তরুণদের, যারা ছাত্র ভিসায় বিদেশে গিয়ে সেখানকার দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠবে। এজন্য তারা গরিব দেশের মেধাবী তরুণদের ওয়েলকাম জানাতে মুখিয়ে থাকে। অফার করে নানা রকম সুযোগ-সুবিধার। অনেক দেশে পড়াশোনার পর পোস্ট স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট বা পারমানেন্ট রেসিডেন্টের পথ খুলে দেয়।’
জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদেশ যাওয়াকে ইতিবাচক মনে করলেও তিনি একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘কিন্তু দেশের আলো-হাওয়ায় বড় হয়ে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পড়াশোনার ভিত গড়ার পর নিছক একটু ভালো থাকার জন্য উন্নত ও অমুসলিম-প্রধান দেশকে সার্ভ করা নিশ্চয়ই একজন মুসলিম তরুণের কাম্য বিষয় হতে পারে না। বাবা-মা যতদিন বেঁচে থাকেন, ততদিন দেশের সাথে এই শ্রেণির মানুষের নিভু নিভু সম্পর্কটা হারিকেনের সলতের মতো টিকে থাকে। বাবা-মার মৃত্যুর পর অনেকে দেশের সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে সেই টাকা বৈদেশিক সুখে বিনিয়োগ করে। দেশে তাদের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না।’
তরুণদের মধ্যে দেশত্যাগের এই প্রবণতার কারণ বিশ্লেষণ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, ‘এর জন্য কি শুধুই তরুণদের ভোগবাদী মানসিকতা দায়ী? শিক্ষার্থীদের কাঠগড়ায় তুলবার আগে সবার প্রথমে নিজেদের ব্যর্থতার দিকে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও আমরা দুর্নীতিমুক্ত, অপরাধহীন, স্থিতিশীল, বাসযোগ্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পাওয়ার মতো একটি দেশ গড়ে তুলতে পারিনি, যে দেশ নিয়ে একজন মেধাবী তরুণ স্বপ্নের বীজ বুনবে।’
শায়খ আহমাদুল্লাহর দাবি, বর্তমান দেশে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নেই। ঘুষ ও রেফারেন্স ছাড়া চাকরি পাওয়া দুঃসাধ্য, জীবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা বিরাজমান। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারগুলো সর্বদা আতঙ্কে থাকে। এমন অনিশ্চয়তার মাঝে উন্নত দেশগুলো যখন অ্যাম্বাসি খুলে মেধাবীদের স্বাগত জানাচ্ছে, তখন এই দেশে স্বপ্ন দেখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে প্রতিকূলতার মাঝেও দেশপ্রেমের আহ্বান জানিয়ে তরুণদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘কেউ দেশটাকে প্রস্তুত করে দেয়নি বলে আমি কি পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করব না? নিরুপদ্রব জীবনের জন্য সবাই যদি বিদেশকেই ঠিকানা বানায়, তবে চেইঞ্জ মেকার হবে কে? প্রকৃতপক্ষে আমাদের তরুণদের সামনে কোনো ভিশন বা আদর্শ নেই, যার জন্য সে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে। অধিকাংশ পরিবার, এমনকি খোদ রাষ্ট্রও তরুণদের আদর্শবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট নয়; বরং ধর্মবিযুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে নিছক ভোগবাদী এবং স্বার্থপর করে গড়ে তোলা হচ্ছে।’
মেধাবীদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার এই ধারা রুখতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার কথা পুনরায় উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেই সাথে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে, যেন আগামী প্রজন্ম আদর্শবাদী এবং শেকড়মুখী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সর্বোপরি তরুণদের ভোগবাদী জীবনের পরিবর্তে চ্যালেঞ্জের জীবন বেছে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, ভোগে নয়, ত্যাগের মাঝেই রয়েছে প্রকৃত সুখের ঠিকানা।’
একটি দেশের উন্নতির মূল ভিত্তি হলো তরুণদের মেধা বলে মন্তব্য করে শায়খ আহমাদুল্লাহ লেখেন, ‘সেই মেধা যদি বাইরে চলে যায় এবং বাইরের উন্নয়নে তা ব্যয় হয়, তবে সেই দেশ কোনোভাবেই সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় উঠতে পারে না। তাই মেধা পাচার রোধে আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।’