সুনীল কি আসলেই বেঁচে আছেন, নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে? সুন্দরবনের সাধারণ মৌয়াল থেকে জলদস্যু দলের প্রধান হয়ে ওঠা মার্শাল কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করতে পারবেন? ডুমুরঝাঁপির অসহায় মানুষগুলো কি শেষ পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবেন? ‘ফেউ’ ধারাবাহিকটি দেখার পর দর্শকদের মনে যেসব প্রশ্ন দানা বেঁধেছিল, এবার সেগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি জানা যাবে। আগামী ১২ নভেম্বর চরকি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘ফেউ কমপ্লিট সাগা’।
তবে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এটি ‘ফেউ’–এর দ্বিতীয় কোনো মৌসুম নয়। বরং প্রথম মৌসুমের নির্দিষ্ট কিছু অংশের সাথে বাকি গল্পের সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিকটি। চরকির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মোট ৯ পর্বের এই ‘ফেউ কমপ্লিট সাগা’ মুক্তি পাবে ১১ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টায়, যা মূলত ১২ নভেম্বরের শুরু।
জঙ্গলের নিয়ম ভাঙলে কী হয়
গত ৩ নভেম্বর রাতে এই ধারাবাহিকটির একটি প্রচার-ঝলক বা টিজার প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে জঙ্গলের নিজস্ব কিছু কঠোর নিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সংলাপে বলা হয়েছে, “আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, জঙ্গলের নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। সেগুলো ভাঙলে বিপদে পড়তে হয়।” এই সতর্কবার্তার পাশাপাশি রহস্যময় কিছু দৃশ্যের মাধ্যমে আসন্ন সংঘাতের আভাস দেওয়া হয়েছে।
গল্পের কাহিনীতে রহস্যময় মার্শাল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। অন্যদিকে, তরুণ ড্যানিয়েল জড়িয়ে পড়েন বিদেশি চরদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে। সুন্দরবনের দুর্গম জনপদে তাঁদের এই সংগ্রামের সাথে মিশে আছে ইতিহাস, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা এবং মানুষের আশ্রয় ও অধিকার আদায়ের লড়াই।
বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনার অনুপ্রেরণায় এই কাল্পনিক গল্পটি লিখেছেন রোমেল রহমান ও সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। এর চিত্রনাট্য রচনা করেছেন সিদ্দিক আহমেদ ও সুকর্ণ শাহেদ ধীমান এবং পুরো কাজটির পরিচালনা করেছেন ধীমান।
দ্বিতীয় মৌসুম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ গল্প
নির্মাতার মতে, প্রথম মৌসুমে ইতিহাস, জনপদ এবং সেখানকার মানুষের রাজনৈতিক সংকট ও পটভূমি বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এবার সেই সব ঘটনাপ্রবাহ একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে মিলবে। ড্যানিয়েলের বাবার খোঁজে চালানো অভিযানের পরিণতি এবং মার্শালের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও পরিচয়ের চূড়ান্ত পরিণতি এই সংস্করণে উঠে আসবে। একইসাথে গল্পের পটভূমির ভূ-রাজনৈতিক দিকগুলোও পরিষ্কার হবে।
সুকর্ণ শাহেদ ধীমান বলেন, “প্রথম মৌসুমে আমরা গল্পটির ভিত্তি ও ইতিহাস খুব বিশদভাবে তৈরি করেছিলাম। এবার গল্পটি একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব পাচ্ছে। “ফেউ কমপ্লিট সাগা” দেখলে দর্শক পুরো গল্পটি একেবারে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন। এমনকি যাঁরা প্রথম মৌসুমটি দেখেননি, তাঁরাও এটি দেখলে কোনো অসম্পূর্ণতা বোধ করবেন না। বলতে গেলে, আলাদা করে প্রথম মৌসুম বলে আর কিছু থাকছে না; “ফেউ কমপ্লিট সাগা”ই “ফেউ”–এর আসল ও পূর্ণাঙ্গ গল্প।”
নির্মাতার ভাষ্যে, “এটি শতভাগ দেশি গল্পের ধারাবাহিক। এ গল্পে দক্ষিণবঙ্গের বীরত্বগাথা ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে।”
মার্শাল একজন সংগ্রামীর প্রতিচ্ছবি
‘ফেউ কমপ্লিট সাগা’য় সুনীল ও মার্শালের পরিণতি গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে চঞ্চল চৌধুরী ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরান।
নিজের চরিত্রটি সম্পর্কে ইমরান বলেন, “মার্শাল চরিত্রটি একজন প্রকৃত সংগ্রামীর প্রতিচ্ছবি। তার বেশভূষা, পোশাক, শারীরিক ভাষা ও আচরণে দারুণ একটি গভীরতা রয়েছে। পুরো কাজটির অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ। অবশেষে দর্শক পুরো গল্পটা দেখতে পাবেন এবং এটি দেখার পর তাঁরা আসল রোমাঞ্চটা উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা করছি।”
মৌয়াল থেকে জলদস্যু সর্দার হয়ে ওঠা মার্শালের লড়াই কোথায় গিয়ে শেষ হবে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি কতটা সফল হবেন—তা এই পূর্ণাঙ্গ গল্পে পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছেন নির্মাতা।
প্রায় এক বছর ধরে চিত্রধারণ
২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধারাবাহিকটির শুটিং করা হয়েছে। নির্মাতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা খুলনা, সাতক্ষীরা, মোংলা, বাজুয়া, বটিয়াঘাটা এবং চালনা এলাকায় কাজ করেছেন। সুন্দরবনের অত্যন্ত দুর্গম এলাকাগুলোতেও দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান অভিনয়শিল্পীদের পাশাপাশি এই প্রজেক্টে খুলনা, বাগেরহাট ও বটিয়াঘাটার শতাধিক স্থানীয় শিল্পী অভিনয় করেছেন। এছাড়া এতে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, তানভীর অপূর্ব, হোসাইন জীবন, তাহমিনা অথৈ, রিজভি রিজু, ফাদার জোয়া, বাবলু বোস, এ কে আজাদ সেতু, আনোয়ার হোসেন, রন্তিক দীপু, আমিরুল ইসলাম ও আবিদ মল্লিক।
চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, ““ফেউ”–এর প্রথম মৌসুম মুক্তির পর এর গল্প, চিত্রধারণের স্থান ও দৃশ্যায়ন নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। গল্পের সঙ্গে ইতিহাস, রাজনীতি ও বাবাকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা আছে। সুন্দরবনের খুবই দুর্গম জায়গায় চিত্রধারণ হয়েছিল। বিষয়গুলো দর্শকেরা পর্দায় অনুধাবন করতে পেরেছেন। আশা করছি, দারুণ সব দৃশ্যায়ন এবং নবীন–প্রবীণদের অভিনয়ে ইতিহাস ও সংগ্রামের যাত্রাটা দর্শকদের কাছে আরও উপভোগ্য হয়ে উঠবে।”
কেন নাম ‘ফেউ’
ধারাবাহিকটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে রাজনৈতিক ইঙ্গিত। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাঘের পেছনে থেকে ডেকে তার আগমনের সংকেত দেয় যে শৃগাল, তাকেই বলা হয় ‘ফেউ’। এছাড়া চলতি ভাষায় ‘ফেউ লাগা’ বলতে কাউকে ক্রমাগত বিরক্ত বা উত্ত্যক্ত করা বোঝায়।
নামটি নির্বাচনের কারণ ব্যাখ্যা করে ধীমান বলেন, “গল্পের রাজনৈতিক বর্ণনায় ফেউ প্রাসঙ্গিক। মানুষের স্বভাবজাত আতঙ্ক, ভয় যখন দৈনন্দিন হয়ে যায়, তখনো সেটা ফেউ শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব। সে কারণেই ধারাবাহিকের নামে ফেউ শব্দটা আছে।”
নির্মাতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তুদের ওপর চালানো নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের ছায়া রয়েছে এই গল্পে। দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের একটি অংশ মরিচঝাঁপিতে বসতি গড়েছিলেন, যাদের পরবর্তীতে উচ্ছেদ করা হয়। সেই মর্মান্তিক ইতিহাসের অনুপ্রেরণায় নির্মিত এই কাল্পনিক আখ্যানে মানুষের আশ্রয়, অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন তোলা হয়েছে।