দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী তুর্কি নাটকের এক প্রবল জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বাংলায় ডাব করা তুর্কি সিরিয়ালগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শুধু টেলিভিশন নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই সিরিজগুলোর ছোট ছোট ক্লিপ বা রিলস নিয়মিত ভাইরাল হতে দেখা যায়। তুর্কি সিরিজের এই বিশ্বজনীন চাহিদাকে পুঁজি করতে আগ্রহী বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছরে নেটফ্লিক্সে বেশ কিছু তুর্কি সিনেমা ও সিরিজ মুক্তি পেয়েছে। সেই ধারায় এবার যুক্ত হয়েছে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘নট আ স্ট্রেঞ্জার’। মের্ত বায়কাল পরিচালিত এই সিরিজটি মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই এটি নন–ইংলিশ সিরিজের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। প্রথম দুই সপ্তাহের হিসাব অনুযায়ী, সিরিজটির ভিউ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখে।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ফুন্দা (এলচিন সাঙ্গু), যিনি পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। তবে মা হওয়ার পর সংসার এবং সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি তাঁর শিল্পীজীবন থেকে অনেকটা দূরে সরে যান। নিজের পুরোনো সত্তায় ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাস্তব জীবনের নানা চাপে তা বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য সহজ হয়ে ওঠে না। শেষ পর্যন্ত মেয়ের দেখাশোনার জন্য একজন আয়া নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর এভাবেই তাঁর জীবনে প্রবেশ ঘটে নাজলি (মেলিস সেজেন)-র। সময়ের সাথে সাথে ফুন্দা ধীরে ধীরে নাজলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে তখন, যখন ফুন্দার স্বামী ইলকার (ওজান দোলুনাই) বাড়িতে ফিরে এসে নাজলিকে চিনতে পারেন। জানা যায়, অতীতে তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই পুরোনো সম্পর্কের কথা সামনে আসার পর ফুন্দার জীবনের সবটুকু স্বস্তি যেন মুহূর্তেই উবে যায়। স্বামীর অতীত, বর্তমান সংসার এবং নিজের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি। এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, নাজলি কি কেবল চাকরির উদ্দেশ্যেই এই বাড়িতে এসেছেন, নাকি তাঁর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য?

‘নট আ স্ট্রেঞ্জার’ সিরিজের জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর শক্তিশালী চিত্রনাট্য। গল্পের মূল বিষয়বস্তু কিছুটা চেনা মনে হলেও নির্মাতারা পর্দায় দারুণ রোমাঞ্চ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের মাঝে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হওয়া—চিত্রনাট্যের এই গাঁথুনি এতটাই মজবুত যে দর্শকেরা পরবর্তী পর্বে কী ঘটবে তা জানার তীব্র আগ্রহে থাকেন। পাশাপাশি রহস্যময় নাজলি চরিত্রটিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি পরিবারের যত বেশি আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন, তাঁর অতীত সম্পর্কে জানার কৌতূহলও তত বৃদ্ধি পায়। দর্শকরা কেবল ঘটনার পরিক্রমণই দেখতে চান না, বরং চরিত্রগুলোর আচরণের আড়ালে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করেন।

তবে সিরিজটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। চলচ্চিত্রভিত্তিক অনলাইন গণমাধ্যম ডিসাইডারের পর্যালোচনায় সিরিজটির প্রথম পর্বের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ফুন্দার মানসিক চাপ, নিজের শিল্পীসত্তায় ফিরে যাওয়ার আকুলতা এবং দুই নারী চরিত্রের মধ্যকার রহস্যকে গল্পের গতি এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সব সমালোচক এই সিরিজের বিষয়ে সন্তুষ্ট নন। তুরস্কের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সাবাহর পর্যালোচনায় গল্পের অস্পষ্টতা এবং কিছু বিষয় বারবার ব্যাখ্যা করার প্রবণতা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। ওই দৈনিকটির মতে, গল্পে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও চিত্রনাট্য সব সময় সেই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।