বিলাসবহুল গাড়ির মতোই মোটরসাইকেলের বাজারেও এখন দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত দামি ও বিশেষ কিছু মডেল। এসব মোটরসাইকেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল ইঞ্জিনের ক্ষমতা কিংবা সর্বোচ্চ গতিই বিবেচ্য হয় না, বরং আরও অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত উন্নত উপকরণ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অনন্য নকশা এবং উৎপাদনের সীমিত সংখ্যা—সব মিলিয়েই এর আকাশচুম্বী দাম নির্ধারিত হয়। বর্তমানে নতুন কিছু মোটরসাইকেলের দাম প্রায় ৪ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই তালিকায় ফ্রান্সের মিডুয়াল, ইতালির ডুকাটি এবং এমভি আগুস্তার বিশেষ সংস্করণগুলো শীর্ষস্থানে রয়েছে।
ব্রিটিশ মোটরসাইকেলবিষয়ক সাময়িকী ভিসরডাউনের একটি প্রতিবেদনে বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে দামি মোটরসাইকেলের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকায় মূল্যের দিক থেকে সবার উপরে রয়েছে ফরাসি কোম্পানি মিডুয়ালের টাইপ ১ সিরিজ ৩। এর দাম প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমান বাজার দরে (প্রতি ডলারের দাম ১২৫ টাকা ধরে) এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা প্রায় ৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বিশেষ মডেলের মোটরসাইকেল মাত্র পাঁচটি তৈরি করা হয়েছে। ১ হাজার ৩৬ সিসির ইঞ্জিন সমৃদ্ধ এই যানটি থেকে ১০০ অশ্বশক্তি পাওয়া যায়। হাতে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের কাঠামো এবং বিশেষ কারিগরি নকশার কারণেই এর দাম এত বেশি। ভিসরডাউনের বর্ণনায়, “এটি যন্ত্র প্রকৌশল ও কারুশিল্পের বিশেষ সমন্বয়।”
দামের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডুকাটি সুপারলেগেরা ভি৪ সেন্টেনারিও। ডুকাটির শতবর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে ২০২৬ সালে এই বিশেষ সংস্করণটি তৈরি করা হয়েছে। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর দাম প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পৌণে তিন কোটি টাকা। এই বিশেষ সংস্করণটি মাত্র ১০০টি উৎপাদন করা হয়েছে। এতে রয়েছে ১১০৩ সিসির ইঞ্জিন, যা থেকে ২২৮ অশ্বশক্তি পাওয়া যায়। ডুকাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে কার্বন ফাইবারের ফ্রেম, সুইংআর্ম ও বডিওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া কার্বন সিরামিক ব্রেক ডিস্ক এই মোটরসাইকেলের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে এমভি আগুস্তার সুপারভেলোসে ১০০০ সিরি অরো। এর দাম প্রায় ৮২ হাজার ৫০০ ডলার। এর ৯৯৮ সিসির ইঞ্জিন থেকে ২০৮ অশ্বশক্তি পাওয়া যায়। কার্বন ফাইবারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, বিশেষ নকশা এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি দামি সুপারবাইকের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
এর খুব কাছাকাছি মূল্যের আরেকটি মোটরসাইকেল হলো ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড ব্রাফ সুপিরিয়রের এসএস১০০। এর দাম প্রায় ৮১ হাজার ৯০০ ডলার। ৯৯৭ সিসির ভি-টুইন ইঞ্জিনের এই মোটরসাইকেলটি থেকে ১০২ অশ্বশক্তি পাওয়া যায়। এর নকশায় পুরোনো ব্রিটিশ মোটরসাইকেলের ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির এক চমৎকার সমন্বয় করা হয়েছে।
তালিকায় এরপরের দিকে রয়েছে কাওয়াসাকি নিনজা এইচ২আর, যার দাম প্রায় ৬৯ হাজার ৮০০ ডলার। এর ৯৯৮ সিসির সুপারচার্জড ইঞ্জিন থেকে ৩২৫ অশ্বশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এটি সাধারণ রাস্তায় চালানোর জন্য অনুমোদিত নয়; মূলত রেসিং ট্র্যাকের জন্যই এটি তৈরি। এছাড়া ভিসরডাউনের তালিকায় হার্লে-ডেভিডসনের সিভিও স্ট্রিট গ্লাইড লিমিটেডের মতো বিলাসবহুল মোটরসাইকেলের নামও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মোটরসাইকেল বাজারবিষয়ক প্রতিষ্ঠান সাইকেল ট্রেডারের ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনেও দামি মোটরসাইকেলের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ডুকাটি সুপারলেগেরা ভি৪-এর দাম ১ লাখ ডলারের বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। কার্বন ফাইবারের ফ্রেম, সুইংআর্ম, চাকা এবং উন্নত রেসিং প্রযুক্তির কারণে এই মডেলটি সাধারণ সুপারবাইকের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
নিলামে পুরোনো মোটসাইকেলের দাম ১৩ লাখ ডলার
নতুন মোটরসাইকেলের তুলনায় পুরোনো এবং দুর্লভ মোটরসাইকেলের নিলামমূল্য অনেক বেশি হয়ে থাকে। বিশেষ করে রেসিংয়ের ইতিহাস, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সীমিত উৎপাদনের কারণে সংগ্রাহকদের কাছে এগুলো অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে ওঠে।
নিলামে বিক্রি হওয়া মোটরসাইকেলের মধ্যে সবচেয়ে দামি উদাহরণ হলো ১৯১৫ সালের সাইক্লোন ভি-টুইন। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মেকাম অকশনে মোটরসাইকেলটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। এটি মূলত বোর্ড ট্র্যাক রেসিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। নিউ অ্যাটলাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকাশ্য নিলামে মোটরসাইকেল বিক্রির ক্ষেত্রে এটি একটি রেকর্ড।
এর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ১৯৬৫ সালে তৈরি এমভি আগুস্তা ৫০০ গ্র্যান্ড প্রিক্স। ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিলে যুক্তরাজ্যের বনহামস নিলামে মোটরসাইকেলটি প্রায় ১২ লাখ ৯৯ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। এই মোটরসাইকেলটি একসময় বিখ্যাত রেসার মাইক হেইলউড ও জিয়াকোমো আগোস্তিনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। এছাড়া জন সার্টিসের মালিকানায়ও ছিল এটি। বনহামসের নিলামসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্রেতার প্রিমিয়ামসহ এই দাম নির্ধারিত হয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন মোটরসাইকেলের দাম যেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ লাখ ডলার, সেখানে ঐতিহাসিক ও দুর্লভ মোটরসাইকেল নিলামে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৩ লাখ ডলারে। এই দুই ধরনের বাজারের মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা।
মূলত উন্নত প্রযুক্তি এবং সীমিত উৎপাদনই এসব মোটরসাইকেলের দাম বেশি হওয়ার প্রধান কারণ। কার্বন ফাইবার, টাইটেনিয়াম, বিশেষ ইঞ্জিন, রেসিং প্রযুক্তি এবং হাতে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কারণে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি সীমিতসংখ্যক উৎপাদন হওয়ায় আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য সরবরাহ থাকে খুব কম। আর পুরোনো মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সংগ্রাহকদের প্রবল আগ্রহ নিলামমূল্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।