আন্তর্জাতিক শিল্প সংগ্রাহকদের কাছে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্মের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিশ্বখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান সদবিসের আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশীয় আধুনিক ও সমকালীন শিল্পকলা’র নিলামে বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে, যা ছিল পুরো আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। এবারের এই বিশেষ প্রদর্শনী ও নিলামে বাংলাদেশের চারজন প্রথিতযশা শিল্পীর চারটি অনন্য শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছিল। এই আয়োজনের মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্মের প্রতি সংগ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে স্থানীয় সময় দুপুর দুইটা থেকে এই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের মোট ৭৩টি লটে সাজানো এই নিলামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম এবং রশিদ চৌধুরী। তবে এবারের তালিকায় জয়নুল আবেদিনের কোনো কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিলামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল রশিদ চৌধুরীর একটি ব্যতিক্রমী চক্রাকার ট্যাপেস্ট্রি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শিল্পীদের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিষয়ে বিশিষ্ট শিল্প ইতিহাসবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, “এটা ইতিবাচক যে আন্তর্জাতিক নিলামে বাংলাদেশের শিল্পীদের শিল্পকর্মের চাহিদা বাড়ছে। যদিও নিলামে নকল ছবি বিক্রির চেষ্টা করা হয়। মাঝে মাঝে এমন সংবাদ আমরা পেয়ে থাকি।”
সদবিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, লন্ডনের এই নিলামে মোট ১৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ডের (প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা) চিত্রকর্ম বিক্রি হয়েছে। সামগ্রিক চিত্রকর্মের মধ্যে ৯৯ শতাংশই বিক্রি হয়ে গেছে এবং ৮৯ শতাংশ কাজ তাদের সর্বোচ্চ আনুমানিক মূল্যের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এবারের নিলামে মোট ৯টি বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন মোহন শর্মা, ভূপেন খাক্কর, হুগো ভিলফ্রেড পেডারসেন, অলিন্টো গিলার্ডি, অ্যান্টোনিও পিয়েদাদে দা ক্রুজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনয়নী দেবী, গোপাল ঘোষ এবং ধ্রুব মিস্ত্রী।
সদবিসের ইতিহাসে ‘দক্ষিণ এশীয় আধুনিক ও সমকালীন শিল্পকলা’ বিভাগের সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড গড়েছে এবারের লন্ডন আয়োজন। এই সাফল্য সম্পর্কে সদবিসের দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলা বিভাগের ওয়াল্ডওয়াইড হেড মঞ্জরী সিহারে সুতিন বলেন, “আমাদের বিভাগের জন্য এটি একটি অসাধারণ নিলাম ছিল। ইতিহাসে আমাদের অর্জিত সর্বোচ্চ মোট মূল্য, যা মাত্র গত বছর লন্ডনে আমাদেরই গড়া রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ৯টি নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে এই ফলাফল বাজারের গভীরতা এবং দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলার প্রতি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা উভয়কেই প্রতিফলিত করে। আমাদের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় শুধু বাজারের বৃদ্ধি দেখা নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলার ইতিহাসকে আরও বিস্তৃত, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক হতে দেখা।”
গত তিন দশক ধরে দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে বড় বড় নিলাম প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই অঞ্চলের শিল্পকলার প্রতি আগ্রহী। নিলামের বর্তমান প্রবণতা নিয়ে মঞ্জরী সিহারে সুতিন ই-মেইলে জানান, “দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলা এক অনন্য ও বৈচিত্র্যময় জগৎ। তাই নির্দিষ্ট কোনো একক বৈশিষ্ট্যে একে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। নিলামের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আধুনিক শিল্পীদের কাজের চাহিদা এখনো চূড়ায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই বাজারের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংগ্রাহকেরা এখন কেবল সুপরিচিত নামগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না, বরং এই অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পী ও শিল্প–ইতিহাস নিয়ে অনেক গভীরভাবে জানার ও যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”
দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশও এই বিস্তৃত গল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন জামশেদ ও ডায়ানা মার্কারের সংগৃহীত চিত্রকর্মগুলো নিলামে তুলি, তখন তাতে জয়নুল আবেদিন, রশিদ চৌধুরী ও জুবাইদা আগার মতো বিখ্যাত শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্কার দম্পতির এই সংগ্রহ শুধু শিল্পকর্মের গুণগত মানের জন্যই অনন্য ছিল না। বরং এর পেছনে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটিও ছিল অসাধারণ। ভারতে জন্ম নেওয়া জামশেদ মার্কার ছিলেন পাকিস্তানের অন্যতম বিশিষ্ট কূটনীতিক। জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁদের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁরা সরাসরি তাঁর কাছ থেকেই চিত্রকর্মগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে জয়নুল আবেদিনই তাঁদের সঙ্গে রশিদ চৌধুরীর পরিচয় করিয়ে দেন। এই দম্পতির সংগ্রহে থাকা জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মগুলো পরবর্তীকালে নিলামে তাঁর শিল্পকর্মের সর্বকালের অন্যতম সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়।”
লন্ডনের এই নিলামে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে রশিদ চৌধুরীর একটি চক্রাকার ট্যাপেস্ট্রি। ১৯৭৭ সালে বোনা ‘শিরোনামহীন’ এই শিল্পকর্মটি বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য পরিবারের সংগ্রহ থেকে এসেছে। এই অনন্য ট্যাপেস্ট্রিটি ৭০ হাজার ৪০০ পাউন্ডে (প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা) বিক্রি হয়েছে, যা কিনেছেন দিল্লির এক সংগ্রাহক। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এটি এক বাংলাদেশি সংগ্রাহকের কাছে উপহার হিসেবে যায় এবং নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে অন্য এক সংগ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। অবশেষে উত্তরাধিকার সূত্রে এটি সদবিসের নিলামে আসে। রশিদ চৌধুরীর কাজ নকল হওয়ার বিষয়ে আবুল মনসুর বলেন, “বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলায় পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের মধ্যে একমাত্র রশিদ চৌধুরী তাঁর কাজকে এই অঞ্চলের লোকশিল্পের অনুকরণে আধুনিক চিত্রপটে স্থাপন করেছেন। তাঁর মূল অনুপ্রেরণা ছিল বাংলার প্রতিমা। আর রঙের অনুপ্রেরণা ছিল বাংলার পটচিত্র। আধুনিককালে প্যারিসে শিক্ষার্থী অবস্থায় ট্যাপেস্ট্রি করা শুরু করেছেন। যদিও বয়নশিল্প অনেক প্রাচীন। এরই ঐতিহ্য সূত্রে তিনি ট্যাপেস্ট্রিচর্চা এ দেশে শুরু করেন। এই মাধ্যমে তিনি পথিকৃৎ। একই সঙ্গে তিনি আমাদের ঐতিহ্যের অনুগামী। এই দিক থেকে তিনি খুবই ভিন্ন রকম।”
নিলামে এস এম সুলতানের (১৯২৩–১৯৯৪) আঁকা ১৯৮৭ সালের একটি ‘শিরোনামহীন’ তেলরঙের ছবি ৩৩ হাজার ২৮০ পাউন্ডে (প্রায় ৫৪ লাখ টাকা) বিক্রি হয়। এটিও একটি স্বনামধন্য পরিবারের সংগ্রহ থেকে এসেছে, যা ১৯৯০-এর দশকে ঢাকার লা গ্যালারি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং ২০০০ সালের দিকে অন্য এক সংগ্রাহকের কাছে যায়। এরপর উত্তরাধিকার সূত্রে এটি নিলামে আসে।
মোহাম্মদ কিবরিয়ার (১৯২৯-২০১১) ১৯৭৮ সালে আঁকা একটি বিমূর্ত তেলরঙ ও মিশ্রমাধ্যমের ‘শিরোনামহীন’ ক্যানভাস ৩০ হাজার ৭২০ পাউন্ডে (প্রায় ৫০ লাখ টাকা) বিক্রি হয়েছে। এটি ১৯৮০-এর দশকে সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে নিলামে আসে।
অন্যদিকে, আমিনুল ইসলামের (১৯৩১-২০১১) ১৯৬৭ সালে আঁকা ‘রূপান্তর-৫’ শিরোনামের অ্যাক্রেলিক চিত্রকর্মটি ৩ হাজার ৩২৮ পাউন্ডে (প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা) বিক্রি হয়। ১৯৮০-এর দশকে শিল্পীর কাছ থেকে সংগৃহীত এই ছবিটি ২০২০ সালে অন্য এক সংগ্রাহকের কাছে যায় এবং সেখান থেকেই নিলামে আসে। এই শিল্পকর্মটি সম্পর্কে সদবিস লিখেছে, “গাঢ় মাটির রঙের পটভূমির ওপর উজ্জ্বল হলুদ-সবুজ রঙের লিপিসদৃশ অবয়ব ভেসে উঠেছে, যা জৈবিক ও বিমূর্ত রূপের ঠিক মাঝামাঝি এক অবস্থায় রূপ নিয়েছে।” উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রথম অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে ছবি এঁকেছিলেন আমিনুল ইসলাম।
লন্ডনের এই মর্যাদাপূর্ণ নিলামে ভারত, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তের সংগ্রাহকেরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।