স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং আইনব্যবস্থার ওপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বিদ্যমান বলে দাবি করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। তাঁর মতে, ১৯৭২ সালের সংবিধান ও প্রচলিত আইনগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোকে জনবান্ধব করার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি সরকারের সামনে এক বিশাল সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় সংবিধান দিবস উপলক্ষে জেডিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ‘৭২-এর সংবিধান পর্যালোচনা ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এই সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

নাঈম আহমাদ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়ন ও তা কার্যকর করা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য অর্জন। তিনি পাকিস্তানের সাথে তুলনা করে বলেন, পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিপরীতে এটি ছিল এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য, কারণ পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে প্রায় নয় বছর সময় লেগেছিল।

তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান আইন, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বড় অংশের ঐতিহাসিক শিকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনগুলো এখনো বহাল রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “এসব আইনের অনেকগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার রক্ষা নয়, বরং 'প্রজা শাসন'।” স্বাধীনতার পর এই আইনগুলোর বড় অংশ বহাল থাকায় রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার প্রভাব রয়ে গেছে। সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তৎকালীন বিদ্যমান আইন ও কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হয়েছিল, যার ফলে ৭২-এর সংবিধানেও ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার প্রভাব থেকে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পর্কে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, এই সংবিধানকে ধর্মগ্রন্থের মতো অপরিবর্তনীয় দলিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সময়ের পরিবর্তন, জনগণের অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন বিবেচনা করে সংবিধান পর্যালোচনা করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান রাষ্ট্র ও জনগণকে সব ধরনের স্বৈরশাসন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতে পারেনি। এই সংবিধান বহাল থাকা অবস্থাতেই বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্র প্রধান খুন হয়েছেন এবং দেশে বারবার সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে। এছাড়া শাপলা, পিলখানা ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো রক্তক্ষয়ী ঘটনার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তার ধারাবাহিকতায় সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের একটি রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেই প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

বিএনপি সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে রাষ্ট্রের আইন ও কাঠামোকে মুক্ত করে জনবান্ধব করার সুবর্ণ সুযোগ এখন বিএনপির হাতে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার আলোকে তারা সংবিধান সংস্কার করলে ইতিহাসে নায়কের মর্যাদা লাভ করবে। জনগণও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখবে। অন্যদিকে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে এই সুযোগ কাজে না লাগালে দলটি ইতিহাসে ভিলেন হিসাবে মূল্যায়িত হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া বলেন, “‘৭২-এর সংবিধান একজন ব্যক্তিকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করেছে। এর পরিণতিতে ১৯৭৫ সালের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই সংবিধান সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিএনপির প্রতারণামূলক আচরণের কারণে সেই সম্ভাবনা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

জেডিপির সদস্য সচিব এডভোকেট আব্দুল আলিমের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সভায় আরও আলোচনা করেন প্রধান সংগঠক মোঃ আহছান উল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন রাহাত, যুগ্ম সদস্য সচিব আইমান আন্দালিব, ইয়াসিন আরাফাত রাজ এবং আরিফুল হক চৌধুরী প্রমুখ।