বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একের পর এক আলটিমেটাম এবং ধারাবাহিক কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি মনে করিয়ে দেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, অকথ্য নির্যাতন এবং অসংখ্য নেতা-কর্মীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিএনপি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘রাজপথ বা আন্দোলনের মাঠ কাউকে মৌরসি পাট্টা (পুরুষানুক্রমে ভোগ দখলের বন্দোবস্ত) দেওয়া হয়নি যে আপনারা একের পর এক উসকানি দেবেন আর আমরা চুপ করে বসে থাকব।’
আজ রোববার পুরান ঢাকার আইনজীবী সমিতি ভবনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিটের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে রিজভী বলেন, যারা অতীতে স্বৈরাচারের সামনে নতজানু হয়েছিলেন এবং নিজেদের আদর্শ বিকিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মুখে এখন বিপ্লবের কথা মানায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জনগণের কাছে প্রত্যেকের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত পরিষ্কার।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অভিযোগ করেন, যখন দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই আন্দোলনের নাম করে সংঘাত সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন বিভিন্ন দেশ সফর করে বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করছেন, তখন হঠাৎ করেই রাজপথে এবং বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগই ‘পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির দোসর’ বলে দাবি করেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী।
জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান, দল এই বিষয়গুলোর মূল ভাবনার বিরোধিতা করছে না। তবে জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে। সংবিধানকে একটি জাতির ‘আত্মজীবনী’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনে সংবিধানে বিভিন্ন সংশোধনী আনা হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) থাকতে পারে। তবে এসবের সমাধান লংমার্চ বা সড়ক অবরোধের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং আলোচনার টেবিলে এবং জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সমাধান হতে হবে।
আলোচনার শুরুতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাড়ে তিন দশকের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আদালত প্রাঙ্গণই ছিল তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জন্য শেষ আশ্রয়স্থল। নিজের টানা ৩৫ দিনের রিমান্ডের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ এবং আইনি লড়াই না থাকলে তাঁদের ওপর জুলুমের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যেত। বিচার বিভাগের দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড এবং তৎকালীন বিচারব্যবস্থার দুরভিসন্ধিমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিটের আহ্বায়ক খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বোরহানউদ্দিন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহসিন মিয়া ও গোলাম মোস্তফা, জেলা পিপি ইকবাল হোসেন এবং বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইউনিটের সদস্যসচিব নিহার হোসেন।