দেশ বর্তমানে যখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আন্দোলনের আড়ালে সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। রোববার (০১ নভেম্বর) রাজধানীর পুরান ঢাকায় আইনজীবী সমিতি ভবনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিটের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যখন বিভিন্ন দেশ সফর করে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে গার্মেন্টস খাতসহ রাজপথে হঠাৎ অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের সিংহভাগই পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির দোসর।

বিরোধীদলের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং আল্টিমেটামের তীব্র সমালোচনা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব প্রশ্ন করেন, “আপনারা কাকে ভয় দেখাচ্ছেন?” তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, অমানুষিক নির্যাতন এবং অসংখ্য নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে। রাজপথ বা আন্দোলনের মাঠ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তারা একের পর এক উসকানি দেবে আর বিএনপি নীরব থাকবে। তিনি বলেন, “রাজপথ বা আন্দোলনের মাঠ কাউকে মৌরসী পাট্টা দেওয়া হয়নি যে আপনারা একের পর এক উসকানি দেবেন আর আমরা চুপ করে বসে থাকব।”

রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, অতীতে যাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল স্বৈরাচারের সামনে নতজানু হওয়া এবং নিজেদের আদর্শ বিকিয়ে দেওয়ার ইতিহাস, তাদের মুখে এখন বিপ্লবের কথা মানায় না। কারণ জনগণের কাছে সবার ইতিহাস অত্যন্ত পরিষ্কার। জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি জানান, বিএনপি এই বিষয়গুলোর মূল ভাবনার বিরোধিতা করছে না। তবে তার মতে, যেকোনো জাতীয় ও দূরগামী সিদ্ধান্ত অবশ্যই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গ্রহণ করতে হবে।

সংবিধান প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সংবিধান একটি জাতির আত্মজীবনী। সময়ের প্রয়োজনে এতে বিভিন্ন সংশোধনী আসে।” জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এসব সমস্যার সমাধান লং মার্চ কিংবা সড়ক অবরোধের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং এর সমাধান হতে হবে আলোচনার টেবিলে এবং জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের (টু-থার্ড) মেজরিটির মাধ্যমে।

বক্তব্যের প্রারম্ভে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ৩৫ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন রিজভী। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আদালত প্রাঙ্গণই ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের শেষ আশ্রয়স্থল। নিজের টানা ৩৫ দিনের রিমান্ডের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ এবং আইনি লড়াই না থাকলে তাদের ওপর জুলুমের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যেত।

বেগম খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড এবং তার ওপর চালানো দূরভিসন্ধিমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি তৎকালীন বিচার ব্যবস্থার দলীয়করণের কঠোর সমালোচনা করেন। রিজভী জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি এই দেশের মাটিতেই থাকবে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাবে। কোনো বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত না করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিটের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিহার হোসেন ফারুক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট বোরহানউদ্দিন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহসিন মিয়া, জেলা পিপি অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা ওমর ফারুক কাওসারসহ আরও অনেকে।