বিদেশি আগ্রাসন রুখতে হলে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে বলে মত দিয়েছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। তাঁর মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতেই পরিচালিত হতে হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন নাঈম আহমাদ। শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জেডিপি কর্তৃক ‘শহীদ আবরার ফাহাদ স্মরণ ও বিদেশি আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়।

আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ এবং ওসমান হাদির আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে নাঈম আহমাদ বলেন, “আবরার, আবু সাঈদ ও হাদি—তিনটি নাম শুধু তিনটি ব্যক্তির নাম নয়; তারা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উঠে আসা কিছু মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের প্রতীক। তাদের আত্মত্যাগের উত্তরাধিকার বহন করবে যে প্রজন্ম, তাদের হাতেই উঠবে আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “আবরার আমাদের প্রশ্ন করার সাহসের কথা মনে করিয়ে দেন, আবু সাঈদ অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহসের কথা মনে করিয়ে দেন, আর হাদি আমাদের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার আকাঙ্ক্ষার কথা মনে করিয়ে দেন। তাদের উত্তরসূরি বলতে কোনো ব্যক্তিপূজা নয়; বরং ন্যায়, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় মর্যাদার সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার উত্তরাধিকারী প্রজন্মকে বোঝায়।”

বিদেশি প্রভাব ও আগ্রাসন প্রতিরোধের উপায় নিয়ে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে দেশ রক্ষা সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম, রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিকভাবে জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রই হলো বিদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধের মূলমন্ত্র।

পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলে নাঈম আহমাদ বলেন, “আমরা ভারতপন্থি বাংলাদেশ চাই না, পাকিস্তানপন্থি বাংলাদেশ চাই না, চীনপন্থি বাংলাদেশও চাই না, আমেরিকাপন্থি বাংলাদেশও চাই না। আমরা চাই বাংলাদেশপন্থি বাংলাদেশ। বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের জনগণেরই থাকতে হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তচিন্তা, জ্ঞান ও বিতর্কের জায়গা; কোনো রাজনৈতিক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়। ছাত্ররাজনীতির দোহাই দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন, ভয় দেখানো কিংবা হত্যার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখতে হলে অন্যান্য ক্যাম্পাসেও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ক্যাম্পাস দেওয়া হবে, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলের হামলার আতঙ্কে থাকবে—এমন দ্বৈত নীতি চলতে পারে না।”

জাতীয় ঐকমত্যের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে পানি, সীমান্ত, সমুদ্র, বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো দেশের বিরুদ্ধে জনগণকে দাঁড় করাতে চাই না। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কিন্তু কারও ওপর নির্ভরশীল হবে না; সবার সঙ্গে সহযোগিতা করবে, কিন্তু নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করবে না।”

একই অনুষ্ঠানে ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন নাঈম আহমাদ।

জেডিপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম তাঁর বক্তব্যে বলেন, আধিপত্যবাদ বিরোধী পররাষ্ট্রনীতি ও দেশপ্রেমের আইকন আবরার ফাহাদ যে প্রেক্ষাপটে শহীদ হয়েছিলেন, বর্তমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসীরা সেই একই প্রেক্ষাপট তৈরি করতে গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, “আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী ছাত্রের হত্যাকাণ্ডের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও ফাঁসির আদেশ কার্যকর করতে বিলম্ব করা হচ্ছে, যা অন্যায়।”

বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, আবরার ফাহাদ শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে চেতনা তৈরি করে গেছেন, তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁর মতে, “শহীদ আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ ও ওসমান হাদিদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।”

জেডিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুত্তাকী বিন মুনিরের সঞ্চালনায় এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জেডিপির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ, জনতার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব স্বনাম ফুয়াদ, বাংলাদেশ গ্রিন পার্টির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ইউসুফ আম্মার, জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব হোসেন সাব্বির এবং জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ প্রমুখ।