এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মোট ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া আরও ২৮টি ওয়ার্ড মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ডিএসসিসি ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে একটি বিস্তৃত জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৩২২টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জরিপের আওতায় আসা প্রতি সাতটি বাড়ির প্রায় একটিতে মশার লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে।
মশার প্রজননস্থলের তালিকায় প্রধানত বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বালতি, ড্রাম, মগ এবং ফুলের টব স্থান পেয়েছে। এছাড়া ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতেও লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের মতে, নাগরিকেরা যদি নিজ বাড়ির আঙিনা ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানির বিষয়ে সচেতন হন, তবে মশার প্রজননস্থলের একটি বড় অংশ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
আজ বুধবার নগর ভবন মিলনায়তনে ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ এবং পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধ করার লক্ষ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১২ দিন এই জরিপ চালানো হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে নমুনা হিসেবে ৩০টি করে বাড়ি নির্বাচন করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় ডিএসসিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন। করপোরেশনের দাবি অনুযায়ী, দৈবচয়নের ভিত্তিতে নমুনা বাছাই করে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।
লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে ওয়ার্ডগুলোকে তিনটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। অধিক ও মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ—এই দুই শ্রেণিতেই রয়েছে মোট ৫৭টি ওয়ার্ড, যা দক্ষিণ সিটির মোট ওয়ার্ডের ৭৬ শতাংশ। বাকি ১৮টি ওয়ার্ডকে ‘সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ওয়ার্ডগুলো হলো ১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১। অন্যদিকে, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫।
তথ্য সংগ্রহের কাজে ‘কবো টুলবক্স’ নামক একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তীতে ব্রেটো ইনডেক্স, হাউস ইনডেক্স, কনটেইনার ইনডেক্স ও পিউপা ইনডেক্সের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। তবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক সূচকের মান কিংবা কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিনটি ঝুঁকিশ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
জরিপের বিস্তারিত তথ্যে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বালতিতে লার্ভার উপস্থিতির হার ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ। প্লাস্টিকের ড্রামে এই হার ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, বেজমেন্টের জমা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করপোরেশন জানিয়েছে, নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে প্রায় অর্ধেক এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, মশার প্রজনন ঠেকাতে বাড়ি ও আশপাশের যেসব অপ্রয়োজনীয় পাত্রে পানি জমতে পারে, সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনীয় পানির পাত্রগুলো ঢেকে রাখতে হবে এবং সপ্তাহে অন্তত একবার খালি করে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা ডিম দূর করতে ঘষে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এডিসের ডিম শুষ্ক অবস্থায়ও কয়েক মাস টিকে থাকতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযানের কথা জানিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত এক দিন জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।”
প্রশাসক আরও জানান, জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশকনিধন অভিযান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিশুদের ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষায় প্রতি শনিবার করপোরেশনের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির সময় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও শৌচাগার পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি জানান।