এলজিইডির আঞ্চলিক মহাসড়কে ইট বিছিয়ে তিন মাসেই অন্তত ২০ লাখ টাকা খুইয়েছে পঞ্চগড় পৌরসভা। নতুন করে সংস্কারের জন্য সড়কের দুই ধারে বিছানো ইট আবার তুলেও ফেলা হচ্ছে। তবে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ ইট তোলার সময় ভেঙে যাচ্ছে। যদিও এসব ইটের দাবি ছেড়ে দিয়ে এলজিইডির কাছে নো অবজেকশন বা না দাবি দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এলজিইডি বলছে, তাদের নো অবজেকশন মৌখিক বা লিখিত অবশ্যই আছে।
এদিকে, জনমনে প্রশ্ন উঠেছে অন্য দপ্তরের সড়কে ইট বিছিয়ে সরকারি টাকা অপব্যয় করা হয়েছে। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা তা তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সচেতন মহলের।
অন্যদিকে, অভিযোগ উঠেছে চৌরঙ্গী থেকে বানিয়াপট্টি কালভার্ট পর্যন্ত সড়কের কাজ দ্রুতই এলজিইডি শুরু করবে। বিষয়টি জানার পর থেকে দ্রুতই রাস্তায় ইট বিছানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে দ্রুতই কাজটি সম্পন্ন করেছেন পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রণব চন্দ্র দে। যদিও তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে বানিয়াপট্টি কার্লভার্ট পর্যন্ত সড়কের দুইধারে অবৈধ স্থাপনা ২০২৫ সালের শুরুতে উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। পরে সড়কটি প্রশস্ত করতে বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে ওই বছরই দুই ধারে প্রশস্ত ড্রেনের ব্যবস্থা নির্মাণ করে দেয় জেলা পরিষদ। পরে ড্রেনের পাশের সড়কের অংশে চলতি বর্ষায় পানি জমে কাদা হওয়ায় বালি ছিটিয়ে দায়সারা করে ইট বিছিয়ে দেয় পৌরসভা।
যদিও পৌরসভার দাবি, ২০২৪ সালের শেষের দিকে জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে বানিয়াপট্টি কালভার্ট পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই ধারে ড্রেনের পাশের নরম মাটির উপর দিয়ে যান চলাচল ও পথচারীদের সুবিধার জন্য ইট বিছানোর উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। নতুন করে সড়ক সংস্কারের জন্য সেসব ইট তুলেও ফেলা হচ্ছে। তবে তুলে ফেলা এসব ইটের কোনো দাবি না করে এলজিইডিকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ‘পঞ্চগড় বাজার শ্যামলী বাস কাউটার হতে বানিয়াপাড়া কালভার্ট পর্যন্ত (সিনেমা রোড) প্রায় ৪২০ মিটার রাস্তার উভয় পাশে হার্ড শোল্ডার উন্নয়ন কাজ’ নামে একটি প্রকল্প ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাতে নেয় পঞ্চগড় পৌরসভা। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৮ টাকা। পরে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাজের দরপত্র আহ্বান করে পৌরসভা। কাজটি পায় পৌরসভার উত্তর রামের ডাঙা এলাকার মেসার্স রাইসা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
পরে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ প্রদান করে পৌরসভা। কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ শুরুর কথা ছিল ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি এবং শেষ হবে ১৫ জুন। তবে ওই বছরে কাজ শুরু না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময় বর্ধিত চেয়ে আবেদন করে। পরে ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলেও দ্রুত গতিতে দায়সারাভাবে কাজ সমাপ্ত করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু অন্য দপ্তরের সড়কে নামমাত্র কাজ করে এত টাকা ব্যয় করে পৌরসভা নিজের দেউলিয়াত্বের প্রমাণ দিয়েছে বলে মনে করছেন শহরবাসী।
জেলা শহরের ডোকরো পাড়া এলাকার বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, এগুলো হচ্ছে লুকোচুরি খেলা। শহরের শোভাবর্ধন পৌরসভার করা উচিত। তাদের আরো নাগরিক সেবা পাচ্ছে না নাগরিকেরা। নামে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা কিন্তু নিজেদের উন্নয়ন না করে তারা অন্যের সড়কে কেন ইট বিছিয়ে বাহবা নিতে গেছে। তাদের কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় যা ইচ্ছে তাই করছে।
শহরের কামাতপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ভূট্টু বলেন, পৌরসভা এতটাই দেউলিয়া হয়ে গেছে যে তারা নিজেদের ফান্ডের টাকা অন্য রাস্তায় খরচ করে। এখনো পৌরসভার অনেক রাস্তা বেহাল। পৌরসভার অনেক সড়কে বাতি নেই। শৈশবে তাদের কোনো নজর নেই। উল্টো তারা এলজিইডির সড়কে নিম্নমানের ইট বিছিয়ে সেগুলো আবার নাকি কোনো ধরনের দাবি ছাড়াই দিয়ে দিয়েছে। তারা কোনো আইনের ফাঁক দেখিয়ে এগুলো করেছে উচিত।
পঞ্চগড় পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রণব চন্দ্র দে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সড়কের দুই পাশে যখন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর সাবেক জেলা প্রশাসক সাবেত আলী আমাদেরকে নির্দেশনা দেন সড়কের দুই ধারে ইট বিছিয়ে যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। পরে আমরা কাজটি করি। তবে যে অভিযোগ করা হচ্ছে আমি পূর্বে থেকেই জানি যে সড়কটি এলজিইডি সংস্কার করবে বিষয়টি সঠিক নয়। কারণ এলজিইডি কবে নাগাদ কাজ শুরু করবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময় না পাওয়ায় সাবেক জেলা প্রশাসক সাবেত আলীর নির্দেশনা কাজটি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সড়কে বিছানো ইট বর্তমানে তুলে ফেলা হচ্ছে। তবে ইটগুলো সেলভেজ বা উদ্ধার দেখিয়ে নো অবজেকশন বা না দাবি চেয়েছে এলজিইডি। আমরা তাদেরকে সেটি দিয়েছি।
পঞ্চগড় পৌরসভার প্রশাসক সীমা শারমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, স্থানীয়দের চাহিদার প্রেক্ষিতে ওই সড়কে ইট বিছানোর কাজ হাতে নেওয়া হয়। যাতে তাদের বর্ষায় ওই সড়ক ধরে চলাচলের সুবিধা হয়। আর এলজিইডি তো আগে প্রকল্প পাস করেনি। আমরা কাজ শেষ করার পরে তাদের প্রকল্প পাস হয়েছে।
তবে ওই সড়কে পৌরসভা কাজ করতে পারবে কিনা কিংবা সেলভেজ ইট এলজিইডিকে দেওয়ার কোনো নিয়ম আছে কিনা এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন পৌর প্রশাসক সীমা শারমিন।
এদিকে, জেলা এলজিইডি বলছে এমএস তানিয়া কন্সট্রাকশন নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে বানিয়াপট্টি কালভার্ট পর্যন্ত ৪২০ মিটার ১০ ইঞ্চি উচ্চতার আরসিসি সড়ক নির্মাণ করবে। যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ ৮ হাজার ২৮৫ টাকা। ইতোমধ্যে তাদের কাজ শুরু হয়েছে।
পঞ্চগড় এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মনোজ কুমার আচার্য মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পৌরসভার সঙ্গে আলোচনা করে ইটগুলো সেলভেজ বা উদ্ধার দেখানো হয়েছে। সেগুলোর মৌখিক বা লিখিত নো অবজেকশন (না দাবি) অবশ্যই আছে। তাদের সঙ্গে কথা না বলে তো কাজ শুরু করা যায় না। এছাড়া, ওই সড়কে আমরা দুই কোটি টাকা খরচ করে ৪২০ মিটার আরসিসি সড়ক করছি। যাতে যান চলাচলসহ পথচারীদের চলাচলে সুবিধা হবে।