অন্তঃসত্ত্বা নাতনিকে নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর শেরপুরের নালিতাবাড়ী থেকে জেলা শহরের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যাচ্ছিলেন আঞ্জুয়ারা বেগম (৫৭)। গাজীরখামার হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন স্থানে থাকা খানাখন্দের কারণে অটোরিকশাটি বারবার গর্তে পড়ছিল এবং প্রচণ্ড দুলছিল। এই তীব্র ঝাঁকুনিতে তাঁর নাতনি চরম কষ্ট পাচ্ছিলেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টার লড়াই শেষে তাঁরা হাসপাতালে পৌঁছান।
সড়কের এই শোচনীয় অবস্থার কথা ভেবে আক্ষেপ করে সেদিন দুপুরে আঞ্জুয়ারা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘জেলা শহরের সঙ্গে এই সড়কের দূরত্ব কম, ভাড়াও কম। কিন্তু রাস্তার অবস্থা এত খারাপ যে পুয়াতি নাতিটারে লইয়া দাঁতে দাঁত কামড় দিয়া এই পথ পার হইছি। সড়কটা দেখার কি কেউ নাই?’
কেবল আঞ্জুয়ারা বেগমই নন, প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহারকারী হাজার হাজার মানুষ একই ধরনের দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। শেরপুরের গাজীরখামার হয়ে নালিতাবাড়ী সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও সড়কজুড়ে ছড়িয়ে আছে ইট ও খোয়া। বৃষ্টির ফলে গর্তগুলোতে পানি জমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেরপুর জেলা শহর থেকে নালিতাবাড়ীর দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। সময় ও দূরত্বের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং রোগীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যাতায়াত করেন। স্থানীয়দের মতে, এই সড়কে শতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি ট্রাক, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির ১৭ কিলোমিটার অংশ প্রশস্ত ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল। প্রায় চার বছর পর ২০২০ সালে এই কাজ শেষ হয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন অংশে পুনরায় ভাঙন দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে সড়কের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। গত আগস্টে অটোরিকশাচালকেরা নিজেদের অর্থ ব্যয়ে ভাঙা সড়কের বিভিন্ন গর্তে ইট, বালু ও সুরকি ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করলেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীরখামার বাজারে প্রবেশের আগে তারাগড়, পাকুড়িয়া, চৈতনখিলা, বটতলা, মান্দাখালি, মতিনিপাড়া, বাগবাড়ি ও শেখহাটি এলাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ উঠে গেছে। কোথাও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও উঁচু-নিচু সড়কের গর্তগুলো বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। কাদাপানি মাড়িয়ে হেলেদুলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও মোটরসাইকেলে করে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন পথচারীরা।
এই সড়কে প্রতিদিন যাতায়াত করেন শিক্ষক শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সংস্কারের পর কিছুদিন স্বস্তি মিললেও দ্রুতই বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে, যার ফলে তীব্র ঝাঁকুনির মধ্যে কষ্ট করে চলাচল করতে হয়।
চালকদের অভিযোগ, ভাঙা সড়কের কারণে যানবাহন চালানো এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শেরপুরের অটোরিকশাচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শতাধিক চালক মিলে এই সড়কে যাত্রী আনা-নেওয়া করি। ভাঙা রাস্তার কারণে আমরা চালকেরা নিজেদের চাঁদায় তিনবার গর্ত ভরাট করছি।’
সড়কের এই দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়েছে নালিতাবাড়ীর গোল্লারপাড় এলাকায়। গত জুলাইয়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের স্রোতে সড়কের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে মাঝারি ও বড় যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ছোট যানবাহনগুলো ঝুঁকি নিয়ে সরু অংশ দিয়ে চলাচল শুরু করে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানে বালুর বস্তা দিলেও স্থানীয়দের আশঙ্কা, স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে নদীভাঙনে সড়কের আরও বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শেরপুর এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য একটি বড় প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সদর উপজেলার কামারেরচর থেকে গাজীরখামার হয়ে নালিতাবাড়ী থেকে হালুয়াঘাট উপজেলা পর্যন্ত সড়কটি ওই প্রকল্পের আওতায় সংস্কার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে দ্রুত কাজ শুরু হবে।
সম্প্রতি সড়কটি পরিদর্শন করেছেন বলে জানান শেরপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহমুদুল আশরাফ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই সংস্কারকাজ শুরু হবে। এ ছাড়া সড়কটি প্রশস্ত করে নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাবও গত বছরই পাঠানো হয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে।’