ক্রিকেট মাঠে ভারত ও পাকিস্তানের লড়াই মানেই এখন কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়, বরং করমর্দন নিয়েও তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে এতটাই প্রকট যে, একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা যায়নি তাঁদেরকে। তবে ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই তিক্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না ভারতীয় দলের কোচ নওশাদ মুসা। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। এমনকি প্রয়োজনে পাকিস্তানি ফুটবলারদের জড়িয়ে ধরতেও প্রস্তুত ভারতীয়রা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসর। ম্যাচের আগের দিন বুধবার (৪ নভেম্বর) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটের সাম্প্রতিক করমর্দন বিতর্কটি সামনে আসে। সাফেও কি দুই দলের ফুটবলাররা হাত মেলানো এড়িয়ে চলবেন—এমন প্রশ্নের মুখে পড়েন ভারতীয় কোচ ও অধিনায়ক।

এর জবাবে নওশাদ মুসা বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা তাদের জড়িয়ে ধরতেও চাই।’

একই সুরের আশ্বাস দিয়েছেন ভারতীয় অধিনায়ক নাথান রদ্রিগেস। পাকিস্তানের ফুটবলারদের সঙ্গে করমর্দন কিংবা জার্সি বিনিময় করবেন কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই। এটা বড় কোনো বিষয় নয়। আমরা তা করব।’

অন্যদিকে পাকিস্তানের অধিনায়ক আলমগির গাজীও জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য বজায় রাখতে আগ্রহী তাঁরা। ক্রিকেট ও ফুটবলের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটা ক্রিকেট নয়, এটা ফুটবল। এ কারণেই খেলাটি এত সুন্দর। আমরাও একই কাজ করব।’

মূলত ২০২৫ সালের এশিয়া কাপ থেকে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটে করমর্দন বিতর্ক এক নতুন মাত্রা পায়। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচ খেললেও প্রতিপক্ষের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাননি ভারতীয়রা। এমনকি ফাইনালেও একই দৃশ্য দেখা গেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচেও দুই অধিনায়ক টসের সময় করমর্দন করেননি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দুই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রচলিত সৌজন্য বিনিময়ও দেখা যায়নি।

এমনকি গত ৩ অক্টোবর এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ফাইনালেও একই ঘটনা ঘটে। টসের সময় পাকিস্তানের অধিনায়ক সাহিবজাদা ফারহানের সঙ্গে হাত মেলাননি ভারতের অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার।

তবে ফুটবলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না বলে আশা করছেন দুই দলের ফুটবলাররা। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব সাজি প্রভাকরণও একই মত প্রকাশ করেছেন।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি জানিয়েছেন, ভারত ও পাকিস্তানের ফুটবলাররা করমর্দন করবেন বলেই তাঁর বিশ্বাস। কারণ ফুটবলে এটি প্রচলিত রীতি, যা প্রতিপক্ষ যে দেশই হোক না কেন অনুসরণ করা হয়।

এদিকে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন পাকিস্তানের কোচ নলবার্তো সোলানো। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে পেরু ও চিলির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের তুলনা করেছেন সাবেক এই পেরুভিয়ান ফুটবলার।

সোলানো বলেন, ‘পেরু-চিলির প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটা পাকিস্তান-ভারতের মতো। দুই লড়াইয়ের তীব্রতা একই রকম। সমর্থকদের কাছে এমন ম্যাচের গুরুত্ব কতটা, তা আমি ভালোভাবেই বুঝি।’

তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ থাকলেও মাঠের খেলায় সর্বোচ্চ মনোযোগ রাখতে চান পাকিস্তান কোচ। তাঁর দলের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সাফের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা। সেই পথে প্রথম বাধা হিসেবেই সামনে রয়েছে ভারত। এরপর মালদ্বীপের মুখোমুখি হবে পাকিস্তান।

অন্যদিকে এবারের সাফে দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে এসেছে ভারত। আগামী ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে দেশটির মূল জাতীয় দল। এই কারণে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ নওশাদ মুসার অধীনে তরুণ ফুটবলারদের প্রাধান্য দিয়ে সাফের দল সাজানো হয়েছে।

ভারত এখন পর্যন্ত রেকর্ড নয়বার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এবার দশম শিরোপার লক্ষ্যে মাঠে নামবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

এবারের সাফে অংশ নিচ্ছে মোট ছয়টি দেশ। ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে ‘বি’ গ্রুপে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে মালদ্বীপ। দুই গ্রুপ থেকে দুটি করে দল সেমিফাইনালে উঠবে। আগামী ১৪ নভেম্বর সেমিফাইনাল এবং ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল ম্যাচ।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে তিনটায় মুখোমুখি হবে ভারত ও পাকিস্তান। একই দিন রাত আটটায় ভুটানের বিপক্ষে নিজেদের অভিযান শুরু করবে বাংলাদেশ।

মাঠের লড়াইয়ে ভারত-পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার কথা। তবে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি এবার নজর থাকবে দুই দলের সৌজন্যমূলক আচরণেও। ক্রিকেটে বারবার করমর্দন এড়িয়ে যাওয়ার বিপরীতে ফুটবলে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন দুই দেশের কোচ ও অধিনায়ক। এখন দেখার বিষয়, ঢাকার মাঠে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে কি না।