সুন্দরবনের বনদস্যুদের অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনায় চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। এই অরাজকতা বন্ধ করতে বনদস্যুদের কঠোর দমন এবং তাদের নেপথ্যে থাকা মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে খুলনার কয়রায় এক মানববন্ধনের আয়োজন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কার্যালয়ের সামনে 'উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলন'-এর উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হয়। উক্ত মানববন্ধনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বনজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সংগঠনের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে একে একে বক্তব্য প্রদান করেন উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান, সেক্রেটারি মাওলানা সাইফুল ইসলাম, কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম আব্দুল মালেক, সংগঠনের সাবেক আহ্বায়ক মো. আনোয়ার হোসেন, কয়রা বাজার কমিটির সভাপতি সরদার জুলফিকার আলম, সুজনের সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলাম, কপোতাক্ষ কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিদেশ রঞ্জন মৃধা, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. আনোয়ার হোসেন, জামায়াত নেতা মাস্টার সাইফুল্লাহ হায়দার, মোল্যা শাহাবুদ্দিন শিহাব ও আলহাজ দ্বিন মোহাম্মদ।

পাশাপাশি তাদের বক্তব্যে যোগ দেন সাংবাদিক মো. কামাল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান, মানবাধিকার ব্যুরো কয়রার সাধারণ সম্পাদক জিএম মোনায়েম বিল্লাহ, কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম, সমাজসেবক আসাদুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি রাসেল আহম্মেদ, ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম আজু এবং স্থানীয় জেলে আবু মুছা, মোসানুর ও রবিউল ইসলামসহ আরও অনেকে।

মানববন্ধনে উপস্থিত বক্তারা গভীর উদ্বেগের সাথে জানান যে, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য যাওয়া জেলেদের জন্য বনদস্যুদের অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা এখন বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দস্যুদের এই ত্রাসের কারণে অনেকে তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস মাছ ধরা থেকেও সরে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে শুধু জেলেরা নন, তাদের পরিবারের সদস্যরাও চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, বনদস্যুতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। দস্যুদের বিরুদ্ধে কেবল অভিযান চালালেই হবে না, বরং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা, অর্থের জোগানদাতা ও সহযোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এই সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে দস্যুতা নির্মূলের দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগগুলো কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তারা বলেন, সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়, এটি উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বন ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই বনদস্যুদের দমনে নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, নদী-খালে টহল জোরদার করা, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মানববন্ধন শেষে সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বনদস্যুদের সহযোগীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান বক্তারা।