টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোরে সুন্দরবনের দুয়ার খুলেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এ বছর ৯ মাসের পর্যটন মৌসুমের জন্য প্রস্তুত। তবে মৌসুমের প্রথম দিনে দিনভর বৃষ্টিপাতের কারণে করমজলসহ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রত্যাশিত ভিড় জমে উঠেনি।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে সড়কপথে সুন্দরবন ভ্রমণ আরও সহজ ও সময়সাশ্রয়ী হয়েছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে এবার পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশাবাদী বন বিভাগ। চাপ সামলানোর জন্য ট্যুর অপারেটররা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। কয়েকশ বিলাসবহুল লঞ্চ ও ট্যুরিস্ট বোটসহ নানা ধরনের জলযান পর্যটক পরিবহনের জন্য অপেক্ষায় রাখা হয়েছে।

একই সাথে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় উপকূলীয় এলাকার জেলে ও বনজীবীরাও তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত হয়েছেন। কেউ জাল মেরামত করছেন, আবার কেউ নৌকা ও ফিশিং ট্রলার প্রস্তুত করছেন। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা আহরণে বনে প্রবেশের অপেক্ষায় তারা।

জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই অরণ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা ও মায়া হরিণ, কুমির, কিং কোবরাসহ প্রায় ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী আবাস করে। জলভাগে ইরাবতীসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন ও প্রায় ২১০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সুন্দরী ও পশুরসহ শত শত প্রজাতির গাছপালায় সমৃদ্ধ এই বন প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তার রূপ পরিবর্তন করে। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা কটকার জামতলা সমুদ্রসৈকতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ছুটে আসেন।

বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে গত ১ জুন থেকে টানা তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। এবার এই সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা আহরণের জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার পাস-পারমিট (বিএলসি) দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এর মাধ্যমে বন বিভাগের রাজস্ব আয় গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার মোঃ আজাদ কবির বলেন, "তিন মাস পর্যটক ও জেলে-বনজীবীদের সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় সরকারের কিছুটা রাজস্ব কম হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি উপকার হয়েছে বনের বনজ, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও বন্যপ্রাণীর বংশবিস্তারে এই নিষেধাজ্ঞা সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।"

তিনি আরও বলেন, "নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দিন করমজলে দিনভর বৃষ্টির কারণে পর্যটকের সংখ্যা কম ছিল। তবে শুক্রবার থেকে পর্যটক আগমনের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি।"

অন্যদিকে, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, "পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে নিরাপত্তাসহ সব পর্যটন স্পট প্রস্তুত করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার প্রথম দিন থেকেই পর্যটক ও জেলে-বনজীবীদের পাস-পারমিট দেওয়া শুরু হয়েছে।"

তিনি বলেন, "সুন্দরবন সুরক্ষায় বাঘ ও হরিণসহ বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা এবং তাদের নির্বিঘ্ন বসবাস নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগে জনবলসংকট রয়েছে; তাই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় পর্যটক ও বনজীবীদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।"

সংশ্লিষ্টরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার থেকে আবারও পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য সুন্দরবনের দুয়ার উন্মুক্ত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাঘ ও হরিণসহ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।