বিরাট কোহলির বিধ্বংসী ফিফটি এবং আর্শদীপ সিংয়ের চার উইকেট শিকারের দাপট থাকলেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে সেরার মুকুট জিতে নিয়েছেন অংশুল কাম্বোজ। ১০ ওভারের স্পেলে মাত্র ২২ রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়েছেন এই পেসার। তার বোলিংয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল নিয়ন্ত্রন; ৬০টি বলের মধ্যে ৪৬টিই ছিল ডট। এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে কোহলি ও আর্শদীপকে পেছনে ফেলে ম্যাচসেরার পুরস্কার পান কাম্বোজ। বৃষ্টিবিঘ্নিত এই ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৫ উইকেটে নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ভারত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড ৪০ দশমিক ২ ওভারে ১৮৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। বৃষ্টির কারণে ভারতের লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয় এবং ৩২ ওভারে ১৪৩ রান সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়। শুভমান গিলের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দল মাত্র ২২ দশমিক ৪ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্য স্পর্শ করে নেয়।
ম্যাচের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে বিরাট কোহলির ব্যাটিং নিয়ে, তবে জয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় পেসাররা। বিশেষ করে কাম্বোজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে মাঝের ওভারগুলোতে রান তুলতে হিমশিম খেয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা।
যশপ্রীত বুমরাহ, মোহাম্মদ সিরাজ ও প্রসিধ কৃষ্ণার মতো তারকাদের অনুপস্থিতিতে ভারতের পেস আক্রমণ নিয়ে সংশয় ছিল। তবে সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন আর্শদীপ সিং, গুরনুর ব্রার এবং অংশুল কাম্বোজ।
ভারতের হয়ে প্রথম আঘাতটি করেন আর্শদীপ। দলীয় ২২ রানেই উইল ইয়ংকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর হেনরি নিকোলসকেও সাজঘরে পাঠিয়ে দেন এই বাঁহাতি পেসার। প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ৪৫ রান তোলার আগেই ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে নিউজিল্যান্ড।
এরপর গুরনুর ব্রারের গতি ও বাউন্সের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বাগতিকরা। টিম সেইফার্টকে আউট করার পর নিজের বলে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে টম ল্যাথামকেও ফিরিয়ে নেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ৩৮ রান করেন সেইফার্ট।
রোহিত শর্মার সরাসরি থ্রোতে ড্যারিল মিচেল রানআউট হলে নিউজিল্যান্ড আরও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ২৮ রান করে মাঠ ছাড়েন মিচেল। দলীয় ৯৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে স্বাগতিকরা।
এরপরই ম্যাচে নিজের প্রভাব আরও স্পষ্ট করেন কাম্বোজ। মিচেল স্যান্টনারকে বোল্ড করার পর নাথান স্মিথকেও আউট করেন তিনি। স্মিথের ব্যাটের কানায় লেগে আসা বলটি দ্বিতীয় স্লিপে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন কোহলি। মাত্র ১ রান করে ফিরতে হয় স্মিথকে।
কাম্বোজের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় দিক ছিল রান আটকে রাখার ক্ষমতা। পুরো ১০ ওভারে তিনি দিয়েছেন মাত্র ২২ রান, যার অর্থ ওভারপ্রতি খরচ ২ দশমিক ২০ রান। দুটি মেডেনের পাশাপাশি ৪৬টি ডট বল প্রতিপক্ষের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।
এই অসাধারণ বোলিংয়ের মাধ্যমে একটি বিশেষ রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন কাম্বোজ। ২০০৫ সালের পর ভারতের কোনো পেসারের পূর্ণ ১০ ওভারের ওয়ানডে স্পেলে এটিই যৌথভাবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী বোলিং। এর আগে আশিস নেহরা, অজিত আগারকার ও যশপ্রীত বুমরাহ ১০ ওভারে ২২ রান দিয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েছিলেন বুমরাহ।
২৫ বছর বয়সী কাম্বোজের জন্য এই সাফল্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গত অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে ১০ ওভারে ৮২ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি তিনি। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ম্যাচসেরা হয়ে তাকালেন তিনি।
অন্যদিকে চার উইকেট নিলেও আর্শদীপের ১০ ওভারে ৭০ রান খরচ হয়েছে। বিশেষ করে শেষ দিকে ব্লেয়ার টিকনারের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মুখে পড়েন তিনি। টিকনার তার শেষ ওভারে তিনটি ছক্কা হাঁকান।
টিকনার ২৩ বলে ৩৪ রানের ইনিংস খেলে নিউজিল্যান্ডকে ১৮৫ রানে পৌঁছে দেন। শেষ উইকেটে জ্যাকব ডাফির সঙ্গে ৩৯ রান যোগ করেন তিনি। গুরনুর ৪৪ রানে ৩ এবং কাম্বোজ ২২ রানে ২ উইকেট নেন। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের ১০ উইকেটের মধ্যে ৯টিই নিয়েছেন ভারতের পেসাররা, বাকি একটি ছিল রানআউট।
তবে লক্ষ্য তাড়ায় ভারতের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। প্রথম ওভারেই কাইল জেমিসনের বলে মিচেল স্যান্টনারের হাতে ক্যাচ দিয়ে শূন্য রানে বিদায় নেন রোহিত শর্মা। ছয় বল খেলে মাঠ ছাড়েন ভারতীয় ওপেনার।
এরপর অধিনায়ক শুভমান গিলকে সঙ্গী করে ইনিংস সামলান কোহলি। বৃষ্টির কারণে খেলা একাধিকবার বন্ধ হলেও ব্যাটিংয়ের ছন্দ ধরে রাখেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন কোহলি। মাত্র ৩৫ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫১ বলে ১৩টি চার ও একটি ছক্কায় ৭৪ রান করেন তিনি। ওয়ানডেতে তিন নম্বরে ব্যাট করে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন কোহলি।
অন্যদিকে শুভমান গিল কিছুটা ধীরগতিতে ব্যাট করলেও এক প্রান্ত আগলে রাখেন। ৫৬ বলে ৩৭ রান করেন ভারতীয় অধিনায়ক। দ্বিতীয় উইকেটে দুজনের ১১৩ রানের জুটিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ভারতের হাতে।
তবে শেষ দিকে দ্রুত উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে সফরকারীরা। দলীয় ১১৪ রানে গিল ফেরার পর ১২৪ রানের মধ্যেই বিদায় নেন কোহলি ও অক্ষর প্যাটেল। শ্রেয়াস আইয়ার ১৫ রান করলেও অপরাজিত থাকতে পারেননি।
মাত্র ২২ রানের ব্যবধানে চার উইকেট হারিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে ভারত। নিউজিল্যান্ডের হয়ে জ্যাকব ডাফি তিন উইকেট নিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করেন। তবে ভারতের লক্ষ্য তখন নাগালের মধ্যেই ছিল।
শেষ পর্যন্ত লোকেশ রাহুল ও নামান ধির অপরাজিত থেকে দলের জয় নিশ্চিত করেন। নামানের ব্যাট থেকেই আসে জয়সূচক বাউন্ডারি। ২২ দশমিক ৪ ওভারে ৫ উইকেটে ১৪৩ রান তুলে মাঠ ছাড়ে ভারত।