ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে ব্যাট এবং বল—উভয় বিভাগেই অসাধারণ এক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করলেন পাকিস্তানের উদীয়মান অলরাউন্ডার আরাফাত মিনহাস। প্রথমে ব্যাট হাতে হাফ সেঞ্চুরি করে দলকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার পর, বল হাতে একাই তছনছ করে দেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপকে। ২১ বছর বয়সী এই তরুণের ৬ উইকেটের বিধ্বংসী নৈপুণ্যের ওপর ভর করে ইংলিশদের ৮৭ রানে পরাজিত করেছে পাকিস্তান। এই জয়ের ফলে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে জয়লগ এনে সিরিজের ফাইনালের পথে বড় পদক্ষেপ নিল স্বাগতিক দল।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে টসে হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ৩০২ রান সংগ্রহ করে পাকিস্তান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৩৮.৪ ওভারে ২১৫ রানেই সব উইকেট হারিয়ে পরাজিত হয় ইংল্যান্ড। ব্যাট হাতে ৫৮ বলে ৫৯ রান করার পাশাপাশি বল হাতে ৪০ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন আরাফাত। এছাড়া একটি রানআউটেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
পাকিস্তানের ইনিংসের শুরুটা ছিল বেশ বিপর্যয়কর। ম্যাচের প্রথম বলেই গাস অ্যাটকিনসনের বলে আউট হয়ে ফেরেন ফখর জামান। দলীয় ৩১ রানেই বিদায় নেন সাইম আইয়ুব। এরপর বাবর আজম ৩৪ রান করে আউট হলে ১৫তম ওভারে স্বাগতিকদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৫৯ রান। কিছুক্ষণ পর সালমান আলীও আউট হয়ে গেলে ৮১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান।
সেই কঠিন পরিস্থিতি সামলে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন হাসান নওয়াজ ও সাদ বেগ। তবে সাদ ৩৫ রান করে বিদায় নিলে ২৮তম ওভারে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১৩৩। এরপরই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন হাসান ও আরাফাত। ষষ্ঠ উইকেটে এই দুজনের মধ্যে ৭৮ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ওঠে, যা পাকিস্তানকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
হাসান নওয়াজ ৭৪ বলে পাঁচটি চার ও চারটি ছক্কায় ৭৯ রান করেন। তাঁর বিদায়ের পর ফাহিম আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে আরও ৭২ রান যোগ করেন আরাফাত। ৫৮ বলে নয়টি চার মেরে ৫৯ রান করে আউট হন এই তরুণ অলরাউন্ডার। অন্যদিকে ফাহিম ২৬ বলে ৩৯ রান করেন। ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেন সনি বেকার।
তবে ইংল্যান্ডের দুর্বল ফিল্ডিং পাকিস্তানকে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ করে দিয়েছিল। মাত্র ১২ রানে থাকা আরাফাতের একটি সহজ ক্যাচ মিস করেন উইকেটকিপার জর্ডান কক্স। পুরো ম্যাচে মোট তিনটি ক্যাচ হাতছাড়া করেন ইংলিশ ফিল্ডাররা।
৩০৩ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দারুণ শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। উদ্বোধনী জুটিতেই ৯১ রান যোগ করেন বেন ডাকেট ও টম ব্যান্টন। ডাকেট ৪৫ রান করে হারিস রউফের বলে আউট হলেও ব্যান্টন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান এবং ৫৩ বলে ৫৭ রান করেন।
তবে ব্যান্টনকে আউট করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন আরাফাত। নিজের প্রথম ওভারেই ইংলিশ ওপেনারকে শাহিন শাহ আফ্রিদির ক্যাচে পরিণত করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। ঠিক পরের ওভারেই তাঁর শিকার হন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। মাত্র ৫ রান করে বোল্ড হন ব্রুক। ১৮তম ওভারে ১ উইকেটে ১১৭ রান তোলা ইংল্যান্ড ২১তম ওভারে ৩ উইকেটে ১২৮ রানে নেমে আসে।
এরপর জো রুট ও স্যাম কারান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে ৩৩ রান করা রুটকে বোল্ড করেন নাসিম শাহ। কারানও ২৭ রানে হারিস রউফের বলে আউট হলে ইংল্যান্ড আরও চাপে পড়ে যায়।
এরপরই ইংলিশ ব্যাটিংয়ে রীতিমতো ধস নামান আরাফাত। জর্ডান কক্সকে এলবিডব্লিউ করার পর জেমি ওভারটনকে ফেরান তিনি। এরপর পরপর দুই বলে উইল জ্যাকস ও আদিল রশিদকে আউট করে নিজের ৬ উইকেটের কৃতিত্ব পূর্ণ করেন। এই ধারাবাহিকতায় হ্যাটট্রিক করার সুযোগও তৈরি হয়েছিল আরাফাতের সামনে, তবে পরের বলটি সামলে নেন সনি বেকার। এরপর রান নিতে গিয়ে আরাফাতের সরাসরি থ্রোতে রানআউট হন গাস অ্যাটকিনসন। ২১৫ রানেই শেষ হয় ইংল্যান্ডের ইনিংস।
এক পর্যায়ে ৩ উইকেটে ১৬৫ রান তোলা ইংল্যান্ড শেষ ৭ উইকেট হারায় মাত্র ৫০ রান যোগ করে। আরাফাত ৮.৪ ওভারে ৪০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ইংলিশদের বিপর্যয়ের প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন। হারিস রউফ পান ২ উইকেট।
এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করেছেন আরাফাত। ওয়ানডেতে একই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি এবং পাঁচ উইকেট নেওয়া তৃতীয় পাকিস্তানি ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়লেন তিনি। মাত্র পঞ্চম ওয়ানডে ম্যাচেই দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ উইকেট পেলেন এই তরুণ। এর আগে অভিষেক ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩২ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
এর আগে সিরিজের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে ৩৭ রানে হারিয়েছিল পাকিস্তান। এবার ইংল্যান্ডকেও পরাজিত করে দুই ম্যাচে দুই জয় নিশ্চিত করল শাহিন শাহ আফ্রিদির নেতৃত্বাধীন দল। অন্যদিকে, ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় পরাজয়ের ধাক্কা খেল ইংল্যান্ড।