অনেকেরই অভ্যাস থাকে শসা কাটার সময় এর খোসা ছাড়িয়ে ফেলার। আবার কেউ কেউ খোসাসহ শসা খেতে পছন্দ করেন। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, শসার খোসা ফেলে দিলে এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান শরীর থেকে বঞ্চিত হতে হয়। কারণ শসার খোসায় থাকে ফাইবার, ভিটামিন কে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এই উপাদানগুলো আমাদের হাড়, চোখ, হৃদযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
তবে শসার খোসা খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মাথায় রাখতে হবে। শসা যদি একদম ফ্রেশ বা সতেজ না হয়, তবে এর খোসা না খাওয়াই শ্রেয়। এছাড়া খোসায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ধুলোবালি বা মোমের প্রলেপ থাকতে পারে। তাই শসার খোসার উপকারিতা এবং এর সাথে জড়িত সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
শসার খোসায় কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?
পুষ্টিবিষয়ক ওয়েবসাইট Lose It-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের খোসাসহ শসায় প্রায় ৪৫ ক্যালরি থাকে। এতে ১ দশমিক ৫ গ্রাম ফাইবার, ২ গ্রাম প্রোটিন এবং ১১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট বিদ্যমান।
পাশাপাশি একটি মাঝারি শসা থেকে প্রায় ৪১ শতাংশ দৈনিক চাহিদার সমপরিমাণ ভিটামিন কে পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া এতে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও পটাশিয়ামও রয়েছে। শসার অধিকাংশ ফাইবার এবং বেশ কিছু উপকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মূলত এর খোসাতেই থাকে। ফলে খোসা ছাড়িয়ে খেলে এই পুষ্টি উপাদানের একটি বড় অংশ হারিয়ে যায়।
শসার খোসা খাওয়ার ৫টি উপকারিতা
১. হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে:
শসার খোসায় থাকা ভিটামিন কে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন কে থাকলে হাড়ের ঘনত্ব বজায় থাকে, যা হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার জন্যও ভিটামিন কে প্রয়োজন। শরীরে এই ভিটামিনের ঘাটতি হলে আঘাতের পর রক্তপাত বন্ধ হতে বেশি সময় লাগতে পারে এবং সহজে কালশিটে পড়তে পারে।
২. হজমশক্তি ভালো রাখে:
শসার খোসায় থাকা খাদ্যআঁশ বা ফাইবার হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতেও ভূমিকা রাখে। এছাড়া ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। খাবারের পর দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে এটি কার্যকরী, ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও শসার খোসা উপকারী হতে পারে।
৩. চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে:
শসার খোসায় লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যারোটিনয়েড থাকে। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের ঝুঁকি কমাতে এই উপাদানগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর শাকসবজি ও ফলের পাশাপাশি খোসাসহ শসাও রাখা যেতে পারে।
৪. শরীরকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সুরক্ষা দেয়:
শসার খোসায় থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যালের পরিমাণ বেড়ে গেলে কোষের ক্ষতি হতে পারে, আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখে।
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক:
শসায় পানির পরিমাণ বেশি এবং ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। অন্যদিকে, এর খোসায় থাকা ফাইবার পেট ভরা রাখে, ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে শসা একটি ভালো খাবার হতে পারে। তবে শুধু শসা বা এর খোসা খেলেই ওজন কমবে না; এর জন্য সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম জরুরি।
শসার খোসা খেলে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে?
শসার খোসায় উপকারী পুষ্টি উপাদান থাকলেও অপরিষ্কার অবস্থায় এটি খাওয়া ঠিক নয়। বাজার থেকে কেনা শসার গায়ে মাটি, জীবাণু, এমনকি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশও থাকতে পারে। এছাড়া কিছু শসা দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে বা চকচকে দেখাতে মোমের প্রলেপ দেওয়া হয়। খাদ্যোপযোগী মোম সাধারণত ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হলেও এর গায়ে ময়লা ও অন্যান্য পদার্থ আটকে থাকতে পারে।
তাই শসা খাওয়ার আগে ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি। যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ, বিশেষ করে ওয়ারফারিন সেবন করেন, তাদের শসার খোসায় থাকা ভিটামিন কে-এর বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা ভালো।
কীভাবে পরিষ্কার করে শসার খোসাসহ খাবেন?
শসার পূর্ণ পুষ্টিগুণ পেতে চাইলে খোসাসহ খাওয়া যেতে পারে। তবে তার আগে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলা উচিত। যেমন—
• শসা ঠান্ডা পানির দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
• পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে শসার বাইরের অংশ আলতোভাবে ঘষে পরিষ্কার করুন।
• ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় বা পেপার টাওয়েল দিয়ে মুছে নিন।
• শসার গায়ে অতিরিক্ত ময়লা বা আবরণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী খোসা ছাড়িয়ে নিন।
• শসার স্বাদ অস্বাভাবিক তিতা হলে সেটি না খাওয়াই ভালো।
মনে রাখতে হবে, শুধু পানি দিয়ে ধুলেই সব ধরনের কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ দূর হয়ে যায় না। তবে প্রবাহমান পানির নিচে ভালোভাবে ঘষে ধুলে ময়লা ও কিছু অবশিষ্টাংশ কমতে পারে।
খোসাসহ শসা যেভাবে খেতে পারেন
শসার খোসার পুষ্টিগুণ পেতে প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্নভাবে এটি যোগ করতে পারেন।
গ্রিক সালাদ: খোসাসহ শসা ছোট ছোট টুকরা করে টমেটো, চিজ ও হালকা ড্রেসিংয়ের সঙ্গে মিশিয়ে সালাদ তৈরি করতে পারেন।
শসা ও ক্রিম চিজ স্যান্ডউইচ: পাউরুটির সঙ্গে ক্রিম চিজ ও খোসাসহ পাতলা করে কাটা শসা দিয়ে সহজেই স্যান্ডউইচ তৈরি করা যায়।
শসার টুনা বোট: শসা লম্বালম্বি দুই ভাগ করে ভেতরের কিছু বীজ বের করে নিন। এরপর সেখানে টুনা, চিকেন বা স্যালমন সালাদ ভরে পরিবেশন করতে পারেন।
সবজি ভাজি: ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে শসা যোগ করে হালকা অলিভ অয়েল দিয়ে রান্না করতে পারেন।
শসার স্যুপ: শসার খোসা না ছাড়িয়ে পুরো শসা ব্লেন্ড করে স্যুপ তৈরি করা যায়। এতে স্যুপে হালকা সবুজ রং ও সতেজ স্বাদ আসে।
তবে শসা ভালোভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব না হলে বা খোসার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে খোসা ছাড়িয়ে খেতে পারেন। মূল বিষয় হলো, শসা যেভাবেই খান না কেন, সেটি যেন পরিষ্কার ও নিরাপদ হয়।