শীতের সকালের মিষ্টি রোদ আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে বাঙালির পিঠাপুলি বা মুচমুচে ভাজাপোড়া খাওয়ার আমেজ চিরকালীন। তবে এই মনোরম আবহের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কিছু শারীরিক অস্বস্তি। শীতকালে অনেকের শরীর ভারী হয়ে যায়, হাত-পায়ের গিটে ব্যথা কিংবা প্রদাহ শুরু হয়। বিশেষ করে যাদের দীর্ঘদিনের বাত বা জয়েন্টের সমস্যা রয়েছে, শীতের এই সময়টি তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, শীতকাল এলেই কেন এমন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়? চিকিৎসকদের মতে, এর মূল কারণ হলো শরীরের ভেতরে তৈরি হওয়া ‘ইনফ্লেমেশন’ বা প্রদাহ। শীতের প্রভাবে আমাদের শরীর ভেতর থেকে কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় যদি আমরা পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করি, তবে ব্যথা ও অস্বস্তি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

শীতের এই শারীরিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে খাদ্যতালিকায় সচেতন পরিবর্তন আনা জরুরি। এমন কিছু খাবার রয়েছে যা নিয়মিত খেলে শরীরের ক্লান্তি, প্রদাহ ও অস্বস্তি অনেকটাই দূর করা সম্ভব। জেনে নিন শীতকালীন সুস্থতায় সহায়ক ১২টি উপকারি খাবারের কথা—

রঙিন সাইট্রাস ফল (কমলা, লেবু, জাম্বুরা)
শীতের রোদে বসে কমলালেবু খাওয়ার আনন্দই আলাদা। কমলা, পাতিলেবু, মাল্টা বা জাম্বুরার মতো ফলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। এই উপাদানগুলো কেবল শীতকালীন সর্দি-কাশিই কমায় না, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর। শরীর সতেজ রাখতে প্রতিদিন একটি করে সাইট্রাস ফল খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

ডালিম বা বেদানা
লাল টকটকে ডালিমের দানায় থাকে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত যে, এর পুষ্টিগুণ অনেক নামি-দামি খাবারের চেয়েও বেশি। শীতকালে প্রতিদিন ডালিম বা এর রস পান করা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারি, যা ভেতরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

পালং শাক ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজি
শীতকাল মানেই বাজারে টাটকা সবুজ শাকসবজির সমারোহ। পালং শাক বা সরিষা শাকের মতো গাঢ় সবুজ শাকে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন কে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এই উপাদানগুলো রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং জয়েন্টের শক্ত ভাব দূর করে নমনীয়তা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

ক্রুসিফেরাস সবজি (ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি)
ফুলকপি, ব্রকলি বা বাঁধাকপির মতো সবজিগুলো শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে। শীতের প্রধান সবজি হিসেবে পরিচিত এই সবজিগুলো স্যুপ হিসেবে কিংবা হালকা সেদ্ধ করে সালাদ বা তরকারিতে রাখলে ইনফ্লেমেশন বা প্রদাহ কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মিষ্টি আলু
শীতের সন্ধ্যায় গরম সেদ্ধ মিষ্টি আলু অনেকেরই প্রিয়। স্বাদের পাশাপাশি এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, বিটা-ক্যারোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরকে উষ্ণ রাখতে এবং জয়েন্টের ব্যথা কমাতে সহায়ক।

মূল জাতীয় সবজি (গাজর, বিট, শালগম)
মিষ্টি আলুর পাশাপাশি গাজর, বিট এবং শালগমের মতো মূল জাতীয় সবজিগুলো শীতে ভীষণ উপকারি। এগুলো অলিভ অয়েল দিয়ে রোস্ট করে বা স্যুপ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। কম তেল-মসলা দিয়ে রান্না করা এই সবজিগুলো স্বাদে সেরা এবং শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দেয়।

ফ্যাটযুক্ত মাছ (স্যামন, টুনা ও দেশি মাছ)
শীতকালে মাংসের বদলে পাতে মাছের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। স্যামন, টুনা কিংবা দেশি রুই-কাতলা ও সামুদ্রিক মাছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে। মাছের এই ভালো ফ্যাট শরীরের প্রদাহ কমিয়ে জয়েন্টের ব্যথা উপশম করে এবং ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করে।

আখরোট
বিকেলের নাশতায় তেলে ভাজা খাবারের পরিবর্তে বাদাম বা আখরোট খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ আখরোটকে শরীরের প্রদাহ দূর করার জাদুকরী খাবার বলা হয়। এর হেলদি ফ্যাট জয়েন্টের ব্যথা কমাতে দারুণ কার্যকর।

অন্যান্য কাঠবাদাম ও বীজ (চিয়া সিড, তিসি বীজ)
আখরোটের পাশাপাশি কাঠবাদাম, চিয়া সিড বা তিসি বীজে প্রচুর প্রোটিন ও ফাইবার থাকে। সকালের নাশতায় ওটসের সাথে বা সালাদে এই বাদাম-বীজগুলো মিশিয়ে খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

আদা
রান্নায় স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি আদা প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আদাতে থাকা ‘জিঞ্জেরল’ নামক উপাদানটি ব্যথা ও প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে। তীব্র শীতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা চা ক্লান্তি ও সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি দেয় এবং শরীরে আরাম জোগায়।

হলুদ
হলুদের ভেতরে থাকা ‘কারকিউমিন’নামক উপাদানটি দীর্ঘকাল ধরে শরীরের প্রদাহ কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রান্নায় পরিমিত হলুদ ব্যবহার অথবা কুসুম গরম দুধে সামান্য কাঁচা হলুদ মিশিয়ে খেলে শরীর ভেতর থেকে সতেজ থাকে।

গ্রিন টি বা হার্বাল টি
শীতকালে বারবার দুধ চা বা কফি খাওয়ার বদলে গ্রিন টি বা বিভিন্ন ভেষজ চা পান করা শ্রেয়। শীতের দিনে পানির পিপাসা কম মনে হলেও শরীর হাইড্রেটেড রাখা জরুরি। নিয়মিত কুসুম গরম পানি ও ভেষজ চা পান করলে শরীরের টক্সিন বা ক্ষতিকর উপাদান বের হয়ে যায়।

সুস্থ থাকতে হলে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও প্রসেসড খাবার থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। অস্বাস্থ্যকর ভাজাপোড়া, প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত মিষ্টি শরীরের প্রদাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই শীতের আমেজে সুস্থ থাকতে এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ