শীতের আমেজ শুরু হতেই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই সময়ে টক দই খাওয়া কি ঠিক? প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শীতকালে টক দই খেলে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা থাকে অথবা সর্দি-কাশির সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। এই ভয়ে অনেকেই শীতের শুরুতেই নিজেদের খাদ্যতালিকা থেকে দই পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। বিশেষ করে যাদের খুব দ্রুত ঠান্ডা লাগে, তারা এই সময়ে দই খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি শীতকালে টক দই খেলে সর্দি-কাশি হয়? নাকি এটি কেবলই একটি ভুল ধারণা?

পুষ্টিবিদদের মতে, শীতকালে দই খাওয়ার বিষয়টি সবার জন্য একরকম নয়। দইয়ের অসাধারণ পুষ্টিগুণ শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই কেবল শীতের ভয়ে অকারণে দই খাওয়া বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

শীতকালে দই খেলে কি ঠান্ডা লাগে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সর্দি-কাশির মূল কারণ সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস। দই খাওয়ার ফলে সরাসরি সর্দি বা কাশি হয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং দইয়ে বিদ্যমান প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। উল্লেখ্য যে, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে অন্ত্রের একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে, সবার শরীরের প্রতিক্রিয়া এক নয়। কিছু মানুষ দই খাওয়ার পর গলায় শ্লেষ্মা জমার মতো অনুভূতি অনুভব করতে পারেন। এছাড়া যাদের আগে থেকেই গলাব্যথা, কাশি বা অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা দই খেলে অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই নিজের শরীরের সহ্যক্ষমতা বিবেচনা করে দই খাওয়া উচিত।

শীতকালে টক দই খাওয়ার উপকারিতা কী?

শীতের সময়ে নিয়মিত এবং পরিমিত পরিমাণে টক দই খেলে শরীর নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান লাভ করতে পারে। এর উল্লেখযোগ্য উপকারিতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

হজমশক্তি ভালো রাখে
টক দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং পেটের বিভিন্ন অস্বস্তি কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
দইয়ের উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেহেতু শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ অন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই সুষম খাবারের অংশ হিসেবে দই খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হতে পারে।

হাড় ও দাঁত মজবুত করে
দই ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের একটি চমৎকার উৎস। এই দুটি খনিজ উপাদান হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করতে এবং সুস্থতা বজায় রাখতে অপরিহার্য।

প্রোটিনের চাহিদা পূরণ
দইয়ে উচ্চমানের প্রোটিন থাকে, যা পেশি গঠন এবং শরীরের বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের উৎস হিসেবে দই রাখা যেতে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
দইয়ে থাকা প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে বারবার ক্ষুধা লাগা বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য থাকলে চিনি ছাড়া সাধারণ টক দই বেছে নেওয়া শ্রেয়।

প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ
দইয়ে ভিটামিন বি১২, বি২, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে।

শীতকালে কীভাবে টক দই খাবেন?

শীতকালে দই খাওয়ার সময় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে, যেমন—

• ফ্রিজ থেকে বের করেই সরাসরি খুব ঠান্ডা দই খাবেন না। দইটি কিছুক্ষণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে তারপর খাওয়া যেতে পারে।
• দুপুরের খাবারের সঙ্গে টক দই খাওয়া একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে।
• খিচুড়ি, ভাত বা পরোটার সঙ্গে অল্প পরিমাণে দই মিশিয়ে খেতে পারেন।
• দইয়ের প্রকৃত পুষ্টিগুণ পেতে এতে অতিরিক্ত চিনি মেশানো থেকে বিরত থাকুন।
• সব সময় ফ্রেশ এবং পরিষ্কারভাবে সংরক্ষিত দই খাওয়ার চেষ্টা করুন।

রাতে টক দই খাওয়া কি ক্ষতিকর?

শীতকালে রাতে দই খাওয়া নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় থাকে। প্রচলিত ধারণা হলো, রাতে দই খেলে কফ বা শ্লেষ্মা বেড়ে যায়। তবে রাতে দই খেলেই যে শ্লেষ্মা তৈরি হয় বা সর্দি-কাশি বাড়ে, এমন দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

যাদের হজমে কোনো সমস্যা নেই বা দই খেলে কোনো অস্বস্তি হয় না, তারা চাইলে রাতেও দই খেতে পারেন। তবে যাদের দই খাওয়ার পর গলায় অস্বস্তি, কাশি বা হজমের সমস্যা দেখা দেয়, তাদের রাতে এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।

কারা টক দই খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

যাদের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারে অ্যালার্জি আছে, তাদের দই খাওয়ার আগে সতর্ক হতে হবে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে কারও কারও দই খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা ডায়রিয়ার সমস্যা হতে পারে।

এছাড়া যাদের আগে থেকেই গলাব্যথা বা কাশি রয়েছে, তারা দই খাওয়ার পর শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন। যদি কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলে নিয়মিত অস্বস্তি হয়, তবে সেটি এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তাহলে কি শীতকালে দই খাওয়া বন্ধ করবেন?

শীতকালে টক দই খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত পরিমাণে এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা দই খেলে এর পূর্ণ পুষ্টিগুণ পাওয়া সম্ভব। দই সরাসরি সর্দি-কাশি সৃষ্টি করে না, তবে ব্যক্তিভেদে এর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তাই কেবল প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে নিজের শরীরের প্রয়োজন ও সহ্যক্ষমতা বুঝে শীতের খাদ্যতালিকায় টক দই রাখতে পারেন।

তথ্যসূত্র: Healthians, TV9 Bangla