নারী ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি করতে নতুন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অভিযোগ গ্রহণ এবং স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করেছে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এই বিশেষ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। জানা গেছে, ইতোমধ্যে চার সদস্য নিয়ে কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে এবং বাকি একজন সদস্য হিসেবে একজন সাবেক ক্রিকেটারকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রভাব কিংবা স্বার্থের সংঘাত যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে বর্তমান বিসিবির কোনো কর্মকর্তাকে এই কমিটিতে রাখা হয়নি।

গত বুধবার (৪ নভেম্বর) ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিসিবির অভিযোগ কমিটির সচিব চন্দ্রা ব্যানার্জি জানিয়েছেন, নতুন এই কমিটি ইতোমধ্যে তাদের কাজ শুরু করেছে এবং পঞ্চম সদস্যের নাম চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই তাকে যুক্ত করা হবে।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটির অন্য তিন সদস্য হলেন ব্যারিস্টার নাজিয়া কবির, ব্যারিস্টার আনীতা গাজী রহমান এবং জারিন মাহমুদ হোসেন। উল্লেখ্য, রাশনা ইমাম এর আগে বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচনের আগে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সেই সময়ে তিনি বোর্ডের নারী বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর আগে গত ২৮ অক্টোবর মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিসিবির ওয়ার্কিং কমিটির এক সভায় স্বাধীন অভিযোগ কমিটি গঠনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ২ নভেম্বর বোর্ডের এক পরিচালক জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবটি নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হলেও তখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চার সদস্য নিয়েই কার্যক্রম শুরু করেছে এই কমিটি।

নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই নতুন কমিটি গঠনের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত প্রক্রিয়া যেন বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে চায় বিসিবি। এই কারণেই বর্তমান বোর্ডের কর্মকর্তাদের বাইরে থেকে সদস্য নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে অভিযোগকারী ক্রিকেটাররা কোনো ধরনের চাপ বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই নির্ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন।

কমিটি গঠনের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও নির্যাতন প্রতিরোধে একটি সুনির্দিষ্ট সুরক্ষানীতিও প্রণয়ন করেছে বিসিবি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়মকানুন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই নীতি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চন্দ্রা ব্যানার্জি।

ক্রিকবাজকে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও দেশের আইন অনুযায়ী আমাদের সুরক্ষানীতি তৈরি করা হয়েছে। এখানে কোন ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, তা নির্ধারণ করা আছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে একজন ক্রিকেটার কীভাবে আমাদের কাছে আসবেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় কীভাবে গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হবে, সেটিও নীতিতে উল্লেখ রয়েছে।”

অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নারী বিভাগের ক্রিকেটারদের মাঝে ইতোমধ্যে এই সুরক্ষানীতির বিস্তারিত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিসিবির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিসিবির কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে চন্দ্রা বলেন, “যেকোনো ধরনের নির্যাতন বা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিসিবির জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। কেউ অভিযোগ জানাতে চাইলে কোথায় যোগাযোগ করবেন, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নারী বিভাগেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।”

তবে শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই যে ক্রিকেটারদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করা সম্ভব, তা তিনি স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে অভিযোগ করলে তা প্রকাশ্যে চলে আসবে কি না, কিংবা অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে কি না—এই বিষয়গুলো নিয়ে ক্রিকেটারদের মনে উদ্বেগ থাকতে পারে।

সেই ভয় দূর করাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন চন্দ্রা। তার ভাষায়, “আমি প্রথমেই তাদের ভয় দূর করতে চাই। একজন ক্রিকেটার অভিযোগ জানানোর আগে ভাবতে পারেন, বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসবে কি না বা অন্যরা জেনে যাবেন কি না। এসব ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। সেই বিষয়গুলোও তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে।”

ক্রিকেটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সম্পর্ক বৃদ্ধিতে বিসিবি কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। এসব কর্মশালার মাধ্যমে অভিযোগ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে তারা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। ক্রিকবাজের তথ্যমতে, কক্সবাজারে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা প্রায় ১০০ নারী ক্রিকেটারের জন্য সচেতনতামূলক শিক্ষাকার্যক্রমও শুরু করেছে বিসিবি।

মূলত বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটেই এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো। এর আগে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন, যা তদন্তে বিসিবি আলাদা কমিটি গঠন করেছিল।

জাহানারার সেই অভিযোগের পর ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জোরালো হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তখন যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে অভিজ্ঞ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল।

বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নারী ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিদ্যমান নির্দেশনা অনুযায়ী নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয় বোর্ডকে।