দীর্ঘ নয়টি ম্যাচে জয়ের খরা কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। তবে এই জয় সহজ ছিল না, বরং রীতিমতো নাটকীয় মোড় নিয়ে শেষ হয়েছে ম্যাচটি। ঘরের মাঠে খেলতে নেমে প্রথম ১৭ মিনিটের মধ্যেই দুই গোল হজম করে হারের মুখে পড়েছিল ইংলিশ জায়ান্টরা। কিন্তু সেখান থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে ইতালিয়ান ক্লাব রোমাকে ৩-২ গোলে পরাজিত করেছে মাইকেল ক্যারিকের নেতৃত্বাধীন দল। এই জয়ের মূল কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ম্যাথিউস কুনিয়া, যিনি জোড়া গোল করেছেন। যদিও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছে এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রোমা। প্রথমার্ধেই সফরকারী রোমা দুই গোলে এগিয়ে যায়। তবে বিরতির পর অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজের একটি পেনাল্টি এবং কুনিয়ার জোড়া গোলের সৌজন্যে দুর্দান্ত এক জয় তুলে নেয় স্বাগতিকরা।

এই জয়ের ফলে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা নয় ম্যাচের জয়হীন থাকার দুঃস্বপ্ন কাটিয়েছে ইউনাইটেড। আগের নয়টি ম্যাচে তারা ছয়বার পরাজিত হয়েছিল এবং তিনটি ম্যাচ ড্র ছিল। সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আজারবাইজানের সাবাহ এফকেকে ৪-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। এরপর দীর্ঘ ৫৪ দিন আর জয়ের দেখা পায়নি মাইকেল ক্যারিকের দল।

সাম্প্রতিক এই ব্যর্থতার কারণে ইউনাইটেডের প্রধান কোচের চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগে বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ এবং চেলসির বিপক্ষে ২-০ গোলে হারার পর ক্যারিকের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রোমার বিপক্ষে এই ম্যাচটি তার জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ম্যাচের শুরুতেই আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ইউনাইটেড। মাত্র ১১ মিনিটে রদ্রিগো মোরার বাড়ানো বল ধরে দারুণ ফিনিশিংয়ে রোমাকে এগিয়ে দেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড মাতিয়াস সুলে। ইউনাইটেডের রক্ষণভাগের ফাঁকা জায়গাটি তিনি দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে গোলটি করেন।

এর ছয় মিনিট পর ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয় ইতালিয়ান ক্লাবটি। হ্যারি ম্যাগুয়ারের ভুলে বল পেয়ে ইউনাইটেডের বক্সে শট নেন সুলে। সেটি ঠেকাতে গিয়ে ডিফেন্ডার আয়ডেন হেভেনের হাতে বল লাগলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। স্পট কিক থেকে গোল করতে ভুল করেননি ডনিয়েল মালেন। ফলে মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে স্বাগতিকরা।

প্রথমার্ধে ইউনাইটেডের আক্রমণভাগে প্রত্যাশিত ধার ছিল না। কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও তার সতীর্থরা তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে রোমা আরও গোলের সুযোগ পেয়েছিল। মালেনের একটি শট ঠেকিয়ে দেন ইউনাইটেড গোলরক্ষক সেন্নে লামেন্স। বিরতির ঠিক আগে সুলের আরেকটি শট পোস্টের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। দুই গোলে পিছিয়ে বিরতিতে যাওয়ার সময় নিজেদের সমর্থকদের দুয়োও শুনতে হয় ইউনাইটেড ফুটবলারদের।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট পেয়ে ৫১ মিনিটে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন মিডফিল্ডার কার্লোস বালেবা। তার পরিবর্তে মাঠে নামেন ইউরি তিলেমানস। এরপরই ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে ক্যারিকের দল।

৫৮তম মিনিটে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় ইউনাইটেড। বক্সের ভেতরে কুনিয়াকে ফাউল করেন রোমার জিয়ানলুকা মানচিনি। রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিলে শট নিতে এগিয়ে আসেন অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ। তবে তার প্রথম প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন রোমার গোলরক্ষক দেভিস ভাসকেস।

কিন্তু পেনাল্টি নেওয়ার আগেই রোমার ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে বক্সে ঢুকে পড়েন এবং ফিরতি বল বিপদমুক্ত করেন। ভিএআর পর্যালোচনার পর আবারও পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ পান ব্রুনো। এবার আর ভুল করেননি পর্তুগিজ তারকা। জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান কমান তিনি।

এই গোলের পর ইউনাইটেডের খেলায় বড় পরিবর্তন আসে। আক্রমণের গতি বাড়িয়ে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে স্বাগতিকরা। কিছুক্ষণ পর ব্রুনোর পাস থেকে ব্রায়ান এমবেউমোর নেওয়া শট দুই পোস্টে লেগে ফিরে আসে। অল্পের জন্য সমতাসূচক গোলটি পায়নি তারা। এরপর হ্যারি ম্যাগুয়ারের হেড থেকে সুযোগ পান দিয়োগো দালোত, কিন্তু গোললাইন থেকে তার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন ক্রিস্তান্তে। রোমার রক্ষণভাগের ওপর চাপ বাড়তে থাকলেও সমতাসূচক গোলের অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে ইউনাইটেডের।

অবশেষে ৮৩তম মিনিটে সেই অপেক্ষা শেষ করেন কুনিয়া। ব্রুনোর ক্রস ঠিকমতো বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হন রোমার ডিফেন্ডার লিওনার্দো বালের্দি। সেই ভুলের সুযোগ নিয়ে কাছ থেকে বল জালে পাঠান ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। ফলে ম্যাচে ২-২ সমতা ফিরে আসে।

মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে আবারও গোল করে ইউনাইটেডকে এগিয়ে দেন কুনিয়া। এবার বদলি হিসেবে নামা তরুণ ফুটবলার শিয়া লেসির পাস পেয়ে বক্সের ডান দিক থেকে জোরালো শটে গোল করেন তিনি। রোমা গোলরক্ষকের কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে ঢুকতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের গ্যালারি।

তবে জোড়া গোলের আনন্দের মধ্যেই বিপত্তি ঘটে কুনিয়ার। জয়সূচক গোলের পর জার্সি খুলে দর্শকদের মধ্যে গিয়ে উদ্‌যাপন করায় হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। এরপর যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে বালের্দিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পান। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় ম্যাচের নায়ককে।

শেষ কয়েক মিনিট দশজন নিয়ে খেললেও জয় ধরে রাখে ইউনাইটেড। তাতে টানা নয় ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্যারিকের দল।

ম্যাচ শেষে স্বস্তি প্রকাশ করে ইউনাইটেড কোচ বলেন, “এই মাঠে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটে, জাদুকরী মুহূর্ত তৈরি হয়। বিরতিতে আমরা এ নিয়েই কথা বলেছিলাম। একটি মুহূর্তই পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।”

ক্যারিক আরও জানান, বিরতিতে খেলোয়াড়দের হতাশ না হয়ে ইতিবাচক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তার বিশ্বাস ছিল, একটি গোলই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত শিষ্যদের প্রত্যাবর্তনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও একটি জয় নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে চান না ইউনাইটেড কোচ।

ম্যাচের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট দুই অর্ধের পার্থক্য। অপটার তথ্য অনুযায়ী, প্রথমার্ধে ইউনাইটেডের প্রত্যাশিত গোলের (এক্সজি) পরিমাণ ছিল মাত্র ০.২৪। দ্বিতীয়ার্ধে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২.৪৮। বিরতির পর ১০টি শট নেয় স্বাগতিকরা, যার পাঁচটিই ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে দ্বিতীয়ার্ধে ইউনাইটেডের গোলমুখে কোনো শটই নিতে পারেনি রোমা।

এই জয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চার ম্যাচে ছয় পয়েন্ট হলো ইউনাইটেডের। অন্যদিকে রোমার জন্য এটি আরেকটি হতাশাজনক হার। এর আগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও দুই গোলে এগিয়ে থাকার পর ৪-৩ ব্যবধানে হেরেছিল ইতালিয়ান ক্লাবটি।

এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত এক রেকর্ডও গড়েছে রোমা। ইউরোপিয়ান কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে একই মৌসুমে দুই ম্যাচে অন্তত দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও হেরেছে তারা।

অন্যদিকে বিশেষ একটি রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে ইউনাইটেডও। অপটার তথ্য অনুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অন্তত দুই গোলে পিছিয়ে থেকে চতুর্থবারের মতো ম্যাচ জিতেছে ইংলিশ ক্লাবটি। এই কীর্তিতে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে তারা।

তবে একটি জয়েই সব সংকট কাটছে না ইউনাইটেডের। প্রিমিয়ার লিগে এখনো কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে দলটি। আগামী রোববার (৮ নভেম্বর) অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ঘরের মাঠে নামবে ক্যারিকের শিষ্যরা। রোমার বিপক্ষে এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন আত্মবিশ্বাস ফেরালেও সেই জয়কে ধারাবাহিকতায় রূপ দেওয়াই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।