ব্যাংক ডাকাতির সুনিপুণ পরিকল্পনা, একের পর এক অভাবনীয় মোড়, বিশ্বাসঘাতকতা এবং জীবনযুদ্ধের এক টানটান উত্তেজনাপূর্ণ আখ্যান ‘কলিশন কোর্স’। গত ৩০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ার পরপরই বিশ্বজুড়ে দর্শকদের প্রবল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই স্প্যানিশ ভাষার ক্রাইম থ্রিলারটি। মুক্তির পরদিনই বিভিন্ন দেশের নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে নেয় এই চলচ্চিত্রটি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ১ নভেম্বর নেটফ্লিক্সের দৈনিক সর্বাধিক দেখা সিনেমার তালিকায় এক নম্বরে উঠে আসে এটি।

গল্পের শুরু হয় ব্যাংক ডাকাতি দিয়ে, তবে সেখান থেকেই রহস্যের জাল বিস্তার করতে থাকে। ‘কলিশন কোর্স’-এর পটভূমি ২০১৩ সালের মাদ্রিদ। সেই সময় স্পেন এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে একদল অপরাধী একটি ব্যাংকে ডাকাতির পরিকল্পনা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু তাদের সব পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়নি। ডাকাতির পরপরই ঘটতে শুরু করে একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দেয়।

পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে অপরাধীরা নিজেদের আরও জটিল এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। দলের সদস্যদের ভেতরেই দানা বাঁধতে থাকে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে পুরোনো মিথ্যা, গোপন তথ্য এবং বিশ্বাসঘাতকতার কালো অধ্যায়। ফলে শুধু পুলিশের হাত থেকে পালানোই নয়, নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিপদ সামলানোও হয়ে ওঠে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নেটফ্লিক্সের বর্ণনা অনুযায়ী, ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানে কোনো চরিত্রকেই পুরোপুরি চেনা যায় না। কে সত্য কথা বলছে আর কে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যকে ব্যবহার করছে, তা নিয়ে দর্শকদের মনে তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়।

‘কলিশন কোর্স’-এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর দক্ষ অভিনয়শিল্পীরা। স্পেনের জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে নিয়ে সাজানো হয়েছে ছবির চরিত্রগুলো। প্রত্যেকেই গল্পের রহস্য, উত্তেজনা ও নাটকীয়তা ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্পেনের সুপরিচিত অভিনেত্রী লাইয়া কোস্তা অভিনয় করেছেন কার্লা চরিত্রে। ‘ভিক্টোরিয়া’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি পান, যেখানে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ‘ফুডি লাভ’ ও ‘আনিমাল’-এর মতো কাজেও তাঁকে দেখা গেছে। এই সিনেমাতেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

পেদ্রো চরিত্রে অভিনয় করেছেন কারা এলেখালদে। স্পেনের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ‘স্প্যানিশ অ্যাফেয়ার’ ও ‘সেল ২১১’-এর মতো সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। চরিত্রের গভীরতা ফুটিয়ে তোলা এবং অভিনয়ের বৈচিত্র্যের জন্য এই অভিনেতা বিশেষভাবে প্রশংসিত।

এরনেস্তো চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুইস সাহেরা। তিনি স্পেনের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্রাভিনেতা। ‘দ্য কিংডম’ ও ‘দ্য বিস্টস’-এর মতো সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে ‘দ্য বিস্টস’ সিনেমায় তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের জন্য ২০২৩ সালে গোয়া পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি।

তোমাস চরিত্রে অভিনয় করেছেন তামার নোভাস। শৈশব থেকেই তিনি অভিনয়ের সাথে যুক্ত। ২০০৫ সালে অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের পুরস্কার জয়ী সিনেমা ‘দ্য সি ইনসাইড’-এ অভিনয়ের সুবাদে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান। এরপর স্পেনের বিভিন্ন সিনেমা ও সিরিজে কাজ করেছেন তিনি।

রাউল চরিত্রে দেখা গেছে আলভারো সেরভান্তেসকে। স্পেনের তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন আলভারো। তিনি ‘থ্রি মিটারস অ্যাবাভ দ্য স্কাই’, ‘অ্যাডু’ ও ‘দ্য টাইম ইট টেকস’-এর মতো কাজে অভিনয় করেছেন।

লুইস চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুইস ওমার। কয়েক দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে স্পেনের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। পেদ্রো আলমোদোভার পরিচালিত ‘ব্রোকেন এমব্রেসেস’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান তিনি। তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছবির চরিত্র বিন্যাসে এক বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন স্পেনের নির্মাতা ড্যানিয়েল সানচেজ আরেভালো। ‘ডার্ক ব্লু অলমোস্ট ব্ল্যাক’, ‘সেভেনটিন’ ও ‘কাজিনহুড’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত এই নির্মাতার এটিই প্রথম থ্রিলার সিনেমা। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন ড্যানিয়েল সানচেজ আরেভালো এবং রামন কাম্পোস। প্রযোজনা করেছে বাম্বু প্রোদুকসিওনেস, যারা এর আগে ‘দ্য অ্যাসুনতা কেস’, ‘কোকেন কোস্ট’ ও ‘কেবল গার্লস’-এর মতো কাজ করেছে।

পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ধরনের গল্প বলার আগ্রহ থেকেই তিনি থ্রিলার নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন। দর্শককে অ্যাকশন, সাসপেন্স, রহস্য ও নানা অপ্রত্যাশিত মোড়ের অভিজ্ঞতা দেওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।

ছবিটির দ্রুত জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, গল্পের রহস্যময়তা। ব্যাংক ডাকাতির মতো পরিচিত বিষয় নিয়ে গল্প এগোলেও নির্মাতারা শুধু অপরাধের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং চরিত্রগুলোর গোপন উদ্দেশ্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিশ্বাসঘাতকতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, টানটান উত্তেজনা। ডাকাতির পর কী ঘটবে, কার ওপর বিশ্বাস করা যাবে এবং শেষ পর্যন্ত কারা বেঁচে ফিরবে—এমন প্রশ্ন দর্শককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের সাথে ধরে রাখে।

তৃতীয়ত, অভিনয়শিল্পীদের অভিজ্ঞতা। স্পেনের জনপ্রিয় অভিনেতাদের এক জায়গায় পাওয়া ছবিটির বড় আকর্ষণ। বিশেষ করে লাইয়া কোস্তা, লুইস সাহেরা ও কারা এলেখালদের উপস্থিতি দর্শকদের আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চতুর্থত, নেটফ্লিক্সের আন্তর্জাতিক দর্শক। স্প্যানিশ ভাষার ‘মানি হেইস্ট’-এর মতো সিরিজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হওয়ার পর এই ভাষার অপরাধ ও রহস্যনির্ভর গল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক দর্শকদের এক ধরণের বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ‘কলিশন কোর্স’ সেই দর্শকগোষ্ঠীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

তবে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললেও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া সব ক্ষেত্রে এক রকম হয়নি। স্পেনের কয়েকটি চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনায় ছবিটির চিত্রনাট্য, গল্পের গতি এবং উত্তেজনা তৈরির কৌশলের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে সিনেমার শেষ অংশের দুর্বলতা এবং চরিত্রগুলোর গভীরতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে ছবিটি সবার কাছে সমানভাবে প্রশংসিত না হলেও রহস্য ও অপরাধনির্ভর গল্পের দর্শকদের প্রবল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে।

স্ক্রিনর‍্যান্ট, নেটফ্লিক্সডটকম ও আইএমডিবি অবলম্বনে