বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ জানিয়েছেন, ওই রাতে প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, বারে মদ্যপান এবং পরবর্তীতে টঙ্গীতে পুলিশের ধাওয়ার মুখে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল।

বর্তমানে রিমান্ডে থাকা দীপের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে তাহসিফের মৃত্যুর আগের কিছু ঘটনার খসড়া ধারণা পাওয়া গেলেও, তিনি ঠিক কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন এবং কেন সেখান থেকে উঠে আসতে পারেননি, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। এই রহস্যের জট খুলতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সেদিন ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা টহল পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নৌ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাহসিফ ও তার বন্ধু দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। সে সময় তাহসিফ কোন দিকে গিয়েছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কি না, আর যদি ঝাঁপ দিয়ে থাকেন তবে তাকে উদ্ধারে পুলিশ কেন এগিয়ে যায়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তবে এর জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। অনুমতি পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক পরীক্ষার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে তাহসিফের মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলোর যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে পানিতে পড়ার মুহূর্তে তার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল এবং অ্যালকোহল ও মাদকের প্রভাব তার ওপর কতটা ছিল, তা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

মাদক ও অ্যালকোহল সেবনের পর পানিতে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, হেরোইন ও অ্যালকোহল গ্রহণের পর পানিতে নামা বা সাঁতার কাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হেরোইনসহ ওপিওড জাতীয় মাদক কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম ধীর করে দেয়, যার ফলে তন্দ্রা, ঝিমুনি, চেতনা হারানো এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, অ্যালকোহল শরীরের ভারসাম্য, বিচারক্ষমতা এবং পেশির সমন্বয় ব্যাহত করে। ফলে মাদক ও অ্যালকোহল একসঙ্গে গ্রহণের পর কেউ পানিতে পড়ে গেলে নিজের জীবন রক্ষার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) তথ্যানুযায়ী, হেরোইন সেবনে ব্যথা, ক্ষুধা, যৌন অনুভূতি ও রক্তচাপ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, অস্থিরতা, ঘুমঘুম ভাব, অতিরিক্ত ঘাম কিংবা শরীরে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় হেরোইন গ্রহণ করলে চোখের মণি সংকুচিত হয়ে আসতে পারে। ত্বক ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে ও নীলচে হয়ে যেতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমে দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সেবনকারী অচেতনও হয়ে পড়তে পারেন।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তার পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রক্ত ও ভিসেরার নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, পানিতে ডুবেই তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া না পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০-১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন এবং পড়ার সময় তার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হেরোইন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম ধীর করে দেওয়ায় ব্যবহারকারীর মধ্যে তীব্র তন্দ্রা কিংবা অচেতন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমে যেতে পারে। পানিতে থাকা অবস্থায় কেউ চেতনা হারালে নিজের শরীর ভাসিয়ে রাখা বা সাঁতরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া মাদক গ্রহণের ফলে শরীরের ভারসাম্য ও পেশির সমন্বয় ব্যাহত হতে পারে। ফলে সাঁতার জানা ব্যক্তিও পানিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। অ্যালকোহলের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তবে তাহসিফের ক্ষেত্রে এসব শারীরিক প্রভাব কতটা কার্যকর ছিল, তা পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

পানিতে ডুবে মৃত্যু নিশ্চিত করতে ডায়াটম পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাহসিফের মৃত্যু পানিতে ডুবেই হয়েছে, নাকি পানিতে পড়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এ পরীক্ষায় পানিতে থাকা অতি ক্ষুদ্র জলজ অণুজীব ডায়াটমের উপস্থিতি ও বিস্তার বিশ্লেষণ করা হয়। ফরেনসিক তদন্তে ডুবে মৃত্যুর সম্ভাবনা যাচাইয়ে এটি একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’

অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোথাও হত্যার পর মরদেহ পানিতে ফেলে দেওয়া হলে মৃত্যুর পর রক্ত সঞ্চালন বন্ধ থাকায় ডায়াটমের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত থাকে। তবে শুধু ডায়াটম পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পানির উৎস, নমুনায় দূষণের সম্ভাবনা এবং অন্যান্য ফরেনসিক আলামতও বিবেচনায় নিতে হয়।

অ্যালকোহল ও মাদক একসঙ্গে গ্রহণে ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়ে ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সহকারী পরিচালক ডা. নায়লা পারভীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অ্যালকোহল ও মাদক গ্রহণের পর পানিতে ঝাঁপ দিলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় কেউ পানিতে পড়লে বা ডুবে গেলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়ে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।’

ডা. নায়লা পারভীন আরও বলেন, ‘অ্যালকোহলের পাশাপাশি অন্য মাদক গ্রহণ করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কারণ এতে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও বেশি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অ্যালকোহল ও মাদক গ্রহণের পর পানিতে ঝাঁপ দিলে একজন ব্যক্তি একাধিক কারণে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে তার বেঁচে থাকা কিংবা উদ্ধারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়।’