বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে রহস্যের জাল যেন কাটছেই না। এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে, যার মধ্যে মৃত্যুর আগের রাতের কয়েক ঘণ্টা এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারের সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ এবং তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে এক নারীর উপস্থিতি দেখা গেছে। ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে এই তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের একসঙ্গে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন যে, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তারা কোথায় গিয়েছিলেন? ওই নারী ঠিক কখন তাদের কাছ থেকে আলাদা হলেন? তাহসিফ ও দীপ কীভাবে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছালেন এবং সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল? এসব রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তির মাঠে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন। এমনকি তিনি ওই মাঠে গিয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও তার বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেছে।
তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সিসিটিভিতে দেখা ওই নারীর পরিচয়। কারণ, মৃত্যুর আগের রাতে তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে তার উপস্থিতির কথা আগে জানানো হয়নি। ওই নারী কে, তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী এবং রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তিনি কোথায় গিয়েছেন—এই সব তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে মোটরসাইকেলে করে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও এক নারী। পরে আরেকটি মোটরসাইকেলে করে দীপ সেখানে পৌঁছান এবং এরপর তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায়। রেস্টুরেন্টের অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও ওই নারী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন এবং কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তারা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলে করে চলে যান।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাদের গতিপথ এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, রেস্টুরেন্টে নারীসহ তাহসিফ ও দীপের প্রবেশের ভিডিও তারা দেখেছেন। তবে ওই নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তার পরিচয় জানা গেলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তবে তাদের সঙ্গে ওই নারী কতদূর পর্যন্ত ছিলেন, কোথায় নেমে গেছেন এবং এরপর তিনি কোথায় গেছেন—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীরা জানতে চান, তারা তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তির মাঠে কেন গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে দীপ দাবি করেন, “তিনি ওই মাঠে যাননি। তাহসিফ তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি সেখানে যাবেন।” তদন্তকারীরা তখন জানতে চান, তিনি যদি সেখানে না গিয়ে থাকেন, তাহলে মাঠে মোটরসাইকেলটি কোথায় ছিল— সে তথ্য তিনি কীভাবে জানলেন। এই প্রশ্নের পর দীপ বক্তব্য পরিবর্তন করে জানান, তিনি তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে ওই মাঠে গিয়েছিলেন।
তবে সেখানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও দীপের বক্তব্য তদন্তকারীদের কাছে পরিষ্কার নয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তি-সংলগ্ন ওই মাঠ মাদক সেবনের স্থান হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পরিচিত এবং সেখানে আগেও অভিযান হয়েছে। তাহসিফ ও দীপ কোনো মাদকসংক্রান্ত কারণে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে টঙ্গীর ওই এলাকায় যাওয়ার কারণ সম্পর্কে দীপের বক্তব্যে অসংগতি থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের আরেকটি বড় প্রশ্ন— তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে সেখানে যাওয়ার পর কীভাবে বিচ্ছিন্ন হলেন?
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দীপ প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেন। পরে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান। রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে তিনি বাসায় পৌঁছান বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাহসিফকে সেখানে রেখে দীপ কেন একা চলে গেলেন, সেটিই এখনো তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট নয়।
দীপের সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই। মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ছিল না। ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের মাধ্যমে বিআরটিএ থেকে এর প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে।
দীপের দেওয়া আরেকটি বক্তব্য নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের ইউনিফর্ম পরা দুই ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেছিলেন। এ সময় তাহসিফ পানিতে পড়ে যান। দীপ লুকিয়ে ছিলেন এবং পরে সেখান থেকে চলে যান। তবে তার এ বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সিসিটিভি ফুটেজ, অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে বিষয়টি যাচাই করছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সাঁতার জানা থাকা সত্ত্বেও তাহসিফ কীভাবে পানিতে ডুবে মারা গেলেন? তিনি কোন পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন? সেখানে কেউ তাকে ধাক্কা দিয়েছিল কি না, কিংবা পানিতে পড়ার আগে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না— এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়ে দীপ গণমাধ্যমে এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি জানিয়েছিলেন, উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার শেষে তাহসিফ ও তিনি যার যার বাসার উদ্দেশ্যে চলে যান। পরে তদন্তে তাদের টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার তথ্য সামনে আসে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, দীপের বক্তব্যের কিছু অংশে ঘটনার তথ্য আড়াল করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে তার কোন বক্তব্য সত্য এবং কোনটি অসত্য, তা এখনো তদন্তাধীন।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমও দীপের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শনিবার উত্তরায় নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, দীপের সঙ্গে তার ছেলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দীপ তাদের বাসায় আসা-যাওয়া করতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাহসিফের বাবার ভাষ্য, দীপ তার ছেলেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর তাহসিফ আর ফিরে আসেননি। পরে তদন্তে দীপের টঙ্গীতে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও তার আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “দীপ যা বলেছেন এবং করেছেন, সেগুলো প্রশ্নবিদ্ধ। ঘটনার সঙ্গে কে জড়িত বা কে কী করেছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।” তিনি ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। ঘটনার তিন দিন পর শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় ছেলেকে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন তাহসিফের বাবা। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
এদিকে তাহসিফের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তার আইফোন। নৌ পুলিশ সূত্র জানায়, নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের সময় তার সঙ্গে একটি মানিব্যাগ, হাতঘড়ি ও বন্ধ আইফোন পাওয়া যায়। তখনো মরদেহটির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পরে ওয়াটারপ্রুফ ফোনটি চার্জে দেওয়ার পর সচল হয়। ফোনটিতে একটি কল আসার পর অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে মরদেহটির স্বজন হিসেবে পরিচয় দেন। তার সঙ্গে কথা বলেই পুলিশ নিশ্চিত হয়, উদ্ধার করা মরদেহটি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিসেরা ও রক্তও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
ফরেনসিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাহসিফ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হওয়ায় তার সাঁতার জানা থাকার বিষয়টিও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে স্বাভাবিকভাবে সাঁতার কেটে উঠতে পারেননি— সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর আগে তাহসিফ কোনো মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— রেস্টুরেন্টে থাকা ওই নারী কে, তিনজন সেখান থেকে কোথায় গিয়েছিলেন, ওই নারী কখন আলাদা হন, তাহসিফ ও দীপ কেন টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন, সেখানে কী ঘটেছিল এবং দীপের বক্তব্যে কেন বারবার পরিবর্তন এসেছে। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো পরিষ্কার হবে, রেস্টুরেন্ট থেকে টঙ্গীর মাজার বস্তি পর্যন্ত তাহসিফের শেষ রাতের কয়েক ঘণ্টায় আসলে কী ঘটেছিল।
এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে— তা এখনো নিশ্চিত নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কল ও বার্তা, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।