বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা বাস রুট রেশনালাইজেশন বিশ্বজুড়ে গণপরিবহন খাতের একটি অত্যন্ত পরীক্ষিত ও কার্যকর মডেল। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বিজ্ঞানভিত্তিক এই ব্যবস্থাটি ঢাকার ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর যে প্রচেষ্টাগুলো দেখা গেছে, তার ফলাফল বলে দেয় যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সুপরিকল্পনা ছাড়াই এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছিল। এমনকি এটি বলাও অত্যুক্তি হবে না যে, এই উদ্যোগটি এমনভাবেই শুরু করা হয়েছিল যেন তা ব্যর্থ হয়। অন্যথায়, পুরোনো এবং লক্কড়ঝক্কড় বাসে কেবল নতুন করে রং করে পুনরায় রাস্তায় নামানোর পেছনে আর কী যুক্তি থাকতে পারে?
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘকাল ধরে একবাক্যে স্বীকার করে আসছেন যে, ঢাকার সড়কের বিশৃঙ্খলা ও চরম নৈরাজ্য দূর করার জন্য বাসভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। গত কয়েক দশকে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাকায় প্রায় ৪০০টি রুটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে মাত্র ২০০ কিলোমিটারের মূল সড়কে প্রায় চার হাজার মালিকের আট হাজার বাস চলাচল করছে। পুরো ঢাকা শহর যেন এখন একটি বিশাল বাসস্টপেজে পরিণত হয়েছে। এর অনিবার্য ও করুণ পরিণতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে সড়কে তীব্র রেষারেষি এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের, যারা প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের শিকার হচ্ছেন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু, গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি স্থাপন এবং এআই ক্যামেরা বসানোর মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঢাকার যানজট নিরসন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই সিদ্ধান্তগুলো যে অত্যন্ত কার্যকর, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
গত রবিবার ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর তত্ত্বাবধানে ঢাকার ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আগের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবং এবারও প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রথম দিনে মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদকেরা সরেজমিনে সড়কের যে চিত্র দেখেছেন, তা এককথায় হতাশাজনক। দেখা গেছে, পুরোনো বাসে কেবল রং করে সেগুলো সড়কে নামানো হয়েছে। বাসগুলো আগের মতোই সড়কের মাঝখানে যত্রতত্র থামছে এবং যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। কোথাও কোনো টিকিট কাটার বুথ দেখা যায়নি। এমনকি বাসচালক ও সহকারীদের আচার-আচরণেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ মেলেনি।
অথচ বাস রুট রেশনালাইজেশনের মূল ধারণাই হলো বাস নির্ধারিত স্থানে থামবে। যাত্রীরা নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে সারিবদ্ধভাবে বাসে উঠবেন। বাসের ভেতরে থাকবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, যেখানে যাত্রী ওঠানামার সময় টিকিট স্পর্শ করতে হবে। এছাড়া জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল।
এখন প্রশ্ন জাগে, নতুন বাস রাস্তায় না নামিয়ে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি গ্রহণ না করে কেবল বাসে রং করে দিলেই কি বাস রুট রেশনালাইজেশন হবে? যাত্রীরা যদি যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না পান, তবে এই ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে তৈরি হবে?
সড়কের নৈরাজ্য, প্রাণহানি এবং যানজটের মতো জটিল সমস্যা সমাধানে ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থা চালুর আর কোনো বিকল্প নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ বিশ্বের অনেক শহরেই এই পদ্ধতিতে বাস চলাচল করে। এই বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাটি কীভাবে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের দেশীয় যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ধারণা রয়েছে। বিদেশি অভিজ্ঞতা এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কারিগরি দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে এই ব্যবস্থা সফল করা সম্ভব।
আমরা মনে করি, ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থাকে প্রকৃত অর্থে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে সরকারের বিনিয়োগ ও উদ্যোগের পাশাপাশি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।