রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আগামী রোববার থেকে ছয়টি নির্দিষ্ট রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ছয়টি রুটে মোট ৭৮০টি বাস পরিচালিত হবে। এর মধ্যে চারটি রুটে শুধুমাত্র নন-এসি বাস এবং বাকি দুটি রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ও নন-এসি উভয় ধরনের বাস চালানো হবে।
আগামী রোববার বেলা ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছে। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, সেবার শুরুতে নতুন বাসের পরিবর্তে পুরোনো বাসগুলোকেই রং করে রাস্তায় নামানো হবে। এই কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছয়টি আলাদা কোম্পানিকে।
তবে পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কেবল পুরোনো বাস দিয়ে কোম্পানিভিত্তিক চলাচল শুরু করলে প্রকৃত রুট রেশনালাইজেশন সম্ভব হবে না। তাদের মতে, এই ব্যবস্থায় প্রকৃত সাফল্য পেতে হলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিশেষায়িত বাস এবং স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের আধুনিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এই উদ্যোগের বিষয়ে ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মশিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুরুতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে চাই। একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে—এটা প্রথমে নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরো ধারণা শুরুতেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও প্রাথমিকভাবে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়ন করা হবে। বাসমালিকেরা কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তা পর্যবেক্ষণ করার পর স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৮ অক্টোবরের এক বৈঠকে রাজধানীর বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই বৈঠকে ডিটিসিএর পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে বলা হয় যে রাজধানীর বর্তমান ৯৮টি বাসের রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি করা হবে। প্রতিটি রুট একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে থাকবে এবং জিপিএস ট্র্যাকিং, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট, ই-টিকেটিং ও নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানোর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হবে। তবে ডিটিসিএ এখন পুরোনো বাস দিয়ে দ্রুত এই রুট রেশনালাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে ভিআইপি পরিবহন বাস কোম্পানি ২৫৩টি নন-এসি বাস চালাবে। এই কোম্পানিটি দীর্ঘকাল ধরে এই পথে চলাচল করছে। উল্লেখ্য, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই রুটে শৃঙ্খলা আনতে ‘গোলাপি’ রঙের বাস চালু করা হলেও তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
এছাড়া মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ১৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার রুটে ১৩৩টি বাস চালাবে চিড়িয়াখানা সিটি বাস কোম্পানি। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে ডেমরা পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার রুটে ৭০টি বাস পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ। এই দুটি কোম্পানির বাস আগে থেকেই ঢাকার রাস্তায় চলাচল করছে।
অন্যান্য রুটের মধ্যে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার রুটে ফোর স্টার বাস লাইন ১৫০টি বাস এবং ঘাটারচর থেকে উত্তরা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রুটে পিএনপি সিটি সার্ভিস ১৯০টি বাস পরিচালনা করবে। পাশাপাশি টঙ্গী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার রুটে ২০টি এসি বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার পরিচালনাকারী কোম্পানি হিসেবে ‘ঢাকা চাকা’র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই রুটগুলোতে বর্তমানে ভিআইপি, বিকাশ, দিশারী, তানজিল, মেট্রোলিংক, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময়, মিডলাইন, পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহনের মতো একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করে। নতুন এই ব্যবস্থায় অন্য কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পুরোনো বাস, বিদ্যমান মালিকদের একটি রুটের মধ্যে এনে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে নতুন বাস আনার চেষ্টা চলছে। সরকারি সহায়তা পেলে দ্রুত বাস এনে সেবা আরও উন্নত করা সম্ভব।”
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল আটটি রুটে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন রঙের বাস চালানো। তবে ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগটি আর সামনে এগোয়নি। পরবর্তীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে নতুন পরিকল্পনা করা হয়। ২০২১ সালে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠনের কথা বলা হয় এবং ২৭৮টি রুট কমিয়ে ২২টি করার পরিকল্পনা করা হয়।
ওই বছরের ডিসেম্বরে ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চালু করা হয়। সেখানে কাউন্টারভিত্তিক টিকিট ও নির্ধারিত স্টপেজের ব্যবস্থা থাকলেও অন্য কোম্পানির বাসগুলোকে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি, ফলে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয় এবং কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করা হলেও বাসমালিকদের সাড়া পাওয়া যায়নি। অবশেষে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক বৈঠক করেন এবং ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।