রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। এই নতুন পরিকল্পনার আওতায় বাসের বর্তমান রুটের সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে এবং প্রতিটি নির্দিষ্ট রুটে কেবল একটি নির্ধারিত কোম্পানির অধীনেই বাস চলাচল করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে বিদ্যমান ৯৮টি বাসের পথ বা রুটকে পুনর্বিন্যাস করে মাত্র ৩২টি রুটে নামিয়ে আনা হবে। প্রতিটি রুটে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস চলবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হবে আধুনিক ও নিয়ন্ত্রিত; যেখানে বাসের জন্য নির্ধারিত থামার স্থান বা স্টপেজ, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা, ই-টিকেটিং এবং জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাস চলাচল তদারকি করা হবে।
উল্লেখ্য যে, গত দেড় দশক ধরে বিভিন্ন সরকার এবং দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা একই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বাস চালু করা হলেও পরিবহন মালিকদের অনাগ্রহ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের অভাবের কারণে সেই উদ্যোগগুলো টেকেনি।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রুট র্যাশনালাইজেশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম দুই মাসের মধ্যে বাসের স্টপেজ নির্ধারণ, পুরোনো বাসগুলোর মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একই সময়ে কয়েকটি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস চালু করা হবে এবং আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুটি রুট চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছে।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের এক পরিকল্পনায় পুরোনো বাস সরিয়ে তিন থেকে চার হাজার নতুন বাস রাস্তায় নামানোর কথা ছিল। সে লক্ষ্যে সরকার, ব্যাংক এবং পরিবহন মালিকদের মধ্যে অনেক আলোচনা ও সভা হয়েছিলে। তবে এবার পুরোনো বাসগুলো রং করে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পুরো বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ)। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংস্থাটি একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা প্রদর্শন করে। ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান গতকাল শুক্রবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “৩২টি রুটের মধ্যে আগামী ছয় মাসে পাঁচটি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিবহনমালিকদের নিয়ে পাঁচটি কোম্পানি গঠন করা হবে। এক রুটে একই রঙের বাস চলবে, সেটি নিশ্চিত করা হবে।”
পুরোনো বাস দিয়েই এই রুট র্যাশনালাইজেশন করা হবে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে মশিউর রহমান বলেন, “নতুন নাকি পুরোনো বাস চলবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে। তবে বাসের ফিটনেস আছে কি না, তা দেখা হবে।”
রাজধানীতে একই পথে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের ফলে যাত্রী সংগ্রহের জন্য বাসগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। এর ফলে যত্রতত্র বাস থামানো, অন্য বাসকে পেছনে ফেলার চেষ্টা এবং সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার মূল কথা হলো, একটি রুটের সব মালিককে একটি কোম্পানির অধীনে আনা হবে এবং বিনিয়োগের অনুপাতে তারা মুনাফা পাবেন। চালক ও শ্রমিকরা দৈনিক চুক্তির বদলে মাসিক বেতনভুক্ত হবেন, ফলে যাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে না এবং বাস নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানো-নামানো করবে।
ডিটিসিএর তথ্যমতে, ঢাকায় অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৯৮টি চালু আছে। এই রুটগুলোতে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলাচলের অনুমতি রয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁরা সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে সরকারের নীতিসহায়তা ও ব্যাংকঋণের সুবিধা না পেলে নতুন বাস চালু করা কঠিন। সরকারি সংস্থা বিআরটিসিকে দিয়ে রুট র্যাশনালাইজেশন হবে না, অতীতে তা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে সরকারকে কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।”
গত ২৮ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ কার্যালয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডিটিসিএ একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন পেশ করে, যার ভিত্তিতেই নতুন রুটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সমীক্ষায় ঢাকার ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রার শুরু ও গন্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া ড্রোনের সাহায্যে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত নকশা তৈরি করা হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী সড়ক মাত্র ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে পাঁচটি রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ ও ৫২ আসনের আধুনিক বাস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রুটগুলো হলো বেরাইদ-খিলগাঁও রেলগেট, টিটিপাড়া-সদরঘাট, কাঁচপুর-গাজীপুর চৌরাস্তা, নন্দনপার্ক-ডেমরা এবং শ্রীপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির।
এছাড়া স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য ২৫টি চক্রাকার বাস রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ বাড়াবে এবং প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চাপ কমাবে। তবে এক্ষেত্রে রিকশা চালকদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইতিপূর্বে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক আটটি রুটে ভিন্ন ভিন্ন রঙের বাস চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেমে যায়। পরবর্তীতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে ২০২১ সালে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা করা হয় এবং ২৭৮টি রুট কমিয়ে ২২টি করার কথা বলা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চালু হলেও অন্য কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করতে না পারায় সেই সেবা বন্ধ হয়ে যায় এবং কোটি টাকার যাত্রীছাউনিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও মালিকদের সাড়া পাওয়া যায়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে একাধিক বৈঠক করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ছয় মাসের এই নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঢাকার বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু রুট কমিয়ে ৩২টি করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা ও মান নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানো-নামানো, সময়সূচি মেনে চলা এবং আইন ভাঙলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাসমালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এনে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।”