বেলা ১টা ৩৭ মিনিট। রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে এসে থামে ভিআইপি পরিবহনের একটি বাস। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বাসটি বিমানবন্দরের সামনে যেখানে থেমেছে, সেটি মূল সড়কের মাঝামাঝি। তার কয়েক মিটার সামনে গেলেই বাস থামার নির্ধারিত স্থান। কিন্তু বাসটি এর কোনো তোয়াক্কা না করে মাঝপথেই যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছিল।

এর ছয় মিনিট পর একই কোম্পানির আরেকটি বাস আসে। এটি যাত্রীতে পূর্ণ ছিল। তাই বাসটি মূল সড়কেই যাত্রী নামিয়ে চলে যায়, নতুন করে কয়েকজন যাত্রী উঠতে চাইলে তাঁদের তোলেনি।

অথচ রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই দুটি বাসে নির্দিষ্ট স্থানে (বাসস্ট্যান্ড) থেকে যাত্রী ওঠানামা করানোর কথা ছিল। বাধ্যতামূলক ছিল টিকিট কাটাও। কিন্তু তা করা হয়নি। সবকিছুই ছিল আগের মতো, চালক ও তাঁর সহযোগীর ইচ্ছেমতো। এ ছাড়া আশেপাশের এলাকায় চোখে পড়েনি বাসে ওঠার জন্য টিকিট সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা বা বুথও।

বাস রুট রেশনালাইজেশনার ধারণাটাই এমন যে বাস নির্ধারিত থামার স্থানে থামবে। নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে যাত্রী টিকিট কিনে সারিবদ্ধভাবে বাসে উঠবেন। বাসের ভেতর থাকবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। সেখানে যাত্রী ওঠানামার সময় টিকিট স্পর্শ করবেন। জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার কথা।

গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার রুটে নন-এসি বাস চালানোর জন্য ভিআইপি পরিবহন বাস কোম্পানিকে দায়িত্ব দিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিটির বাস চলাচল করছে। তবে এবারের পার্থক্য হচ্ছে এই পথের অন্য সব কোম্পানি মিলে একটি কোম্পানি করা হয়েছে। তাদের একই রঙের বাস চলার কথা নয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ রুটে গোলাপি রঙের বাস চালু করা হয়েছিল। তবে তাতে প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা ফেরেনি।

ওই সড়কে বেলা ১টা ৫২ মিনিটে একই কোম্পানির আরেকটি বাস থামে বিমানবন্দরের সামনে। এটিও আগের দুটি বাসের মতো যাত্রী ওঠানামা করায় মূল সড়কে। এরপরই আসে একই কোম্পানির আরেকটি গাড়ি, সেটি এসে এই গাড়ির সামনে আড়াআড়ি করে এমনভাবে দাঁড়ায়, যাতে এটি সামনে এগোতে না পারে। এভাবেই চলে বাস দুটির যাত্রী ওঠানামা।

এরপর ১টা ৫৯ মিনিটে একটি বাসে চড়ে বিমানবন্দর এলাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত যান এই প্রতিবেদক। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার চলার পথে সরকার নির্ধারিত কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। যাত্রী ওঠানামা হয়েছে যত্রতত্র, পুরোনো ব্যবস্থায়। এ ছাড়া নতুন বা এক রঙের কোনো বাসও চোখে পড়েনি। যেসব বাস চলতে দেখা গেছে, তার সবই ছিল পুরোনো, অনেকগুলো লক্কড়ঝক্কড়ও।

আমি যাত্রীদের নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছি। কিন্তু কেউ শুনছে না। কাল থেকে গেটলক সার্ভিস চালু করব। যাত্রী পাঁচজন হলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। আমরা (চালক ও সহকারী) তো বেতন পামু।

যেমন বিমানবন্দর ছেড়ে যাওয়া বাসটির পরবর্তী প্রথম থামার নির্দিষ্ট স্থান ছিল উত্তরার জসীমউদ্‌দীন মোড়–সংলগ্ন। কিন্তু এইটুকু পথেই সাতবার থেমেছে বাসটি। এর মধ্যে চারবার যাত্রী নামাতে এবং তিনবার যাত্রী ওঠাতে।

এরপর রাজলক্ষ্মী, আজমপুর, বিএনএস পর্যন্ত যেতেও একই অবস্থা ছিল বাসটির। এরপর বাসটি টঙ্গীমুখী ফ্লাইওভারে (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের জন্য নির্মিত উড়ালসেতু) ওঠে। ওঠার আগেও যাত্রী ওঠানামা করা হয় মূল সড়কেই। ফ্লাইওভারে ওঠার পর ভাড়া নিতে আসেন বাসটির চালকের সহকারী মো. সোহেল।

সোহেল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি যাত্রীদের নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছি। কিন্তু কেউ শুনছে না। কাল থেকে গেটলক সার্ভিস চালু করব। যাত্রী পাঁচজন হলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। আমরা (চালক ও সহকারী) তো বেতন পামু।”

ফ্লাইওভার ধরে এগিয়ে চলা বাসটি উত্তরার হাউস বিল্ডিং পার হয়ে আবদুল্লাহপুরগামী যাত্রীদের ফ্লাইওভারের ওপরে নামিয়ে দেওয়া হয়। আবার সেখান থেকে ওঠেন কয়েকজন যাত্রী। এরপর টঙ্গীবাজার ও টঙ্গীর স্টেশন রোডের যাত্রীদের ওঠানামাও হয় ফ্লাইওভারের ওপর।

টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে এবার ভিআইপি পরিবহনের আরেকটি বাসে ফেরার পথেও একই রকম চিত্র দেখা গেছে। এভাবে বাসটি বিমানবন্দর এলাকায় আসে। এরপর অপেক্ষা করে যাত্রী তোলার জন্য। এই সময়ে অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও চলছিল সমানতালে। তবে এই সময়ে স্থানটিতে ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে পরের গন্তব্য কাওলা যেতে বাসটি সময় নেয় ১৭ মিনিট। সাধারণত সড়কে যানজট না থাকলে ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার দূরত্বের এতটুকু পথ যেতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।

তবে বাসটি কাওলায় এসে দ্রুত পার হয়ে যায়। কাওলায় ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন সদস্য থাকায় বাসটি সেখানে না থেমে দ্রুত এলিভেটেড এক্সেপ্রেসওয়েতে উঠে যায়।

ভাড়া নিতে আসা চালকের সহকারীর কাছে নতুন ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আজকেই শুরু হইসে। কালকে থেকে গেটলক করে দিমু।”

বাসটি ফার্মগেট এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে সড়কেই যাত্রী নামিয়ে যায়। অথচ বাস থামার নির্ধারিত স্থান ছিল আরও কয়েক মিটার সামনে। একই অবস্থা দেখা গেছে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায়ও।

রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ রোববার থেকে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব রুটে ৭৮০টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে বাস চলাচল শুরু হয়। এর মধ্যে চারটি রুটে চলবে শুধু নন-এসি বাস। দুটি রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ও নন–এসি বাস চালানো হবে।

রোববার বেলা ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী।

উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, শুরুতে পুরোনো বাস দিয়েই এই সেবার যাত্রা শুরু হবে। বাসগুলো রং করে নামানো হচ্ছে। পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছয়টি কোম্পানিকে।

মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ১৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার রুটে ১৩৩টি বাস চালাবে চিড়িয়াখানা সিটি বাস কোম্পানি। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে ডেমরা পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার রুটে ৭০টি বাস পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ। এই দুটি কোম্পানির বাস ঢাকার রাস্তায় চলাচল করছে।

এ ছাড়া ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার রুটে ১৫০টি বাস চালাবে ফোর স্টার বাস লাইন। ঘাটারচর থেকে উত্তরা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রুটে ১৯০টি বাস পরিচালনা করবে পিএনপি সিটি সার্ভিস। অন্যদিকে টঙ্গী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার রুটে ২০টি এসি বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ রুটের পরিচালনাকারী কোম্পানি হিসেবে ‘ঢাকা চাকা’র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

‎প্রস্তাবিত এসব রুটের কয়েকটিতে বর্তমানে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিআইপি, বিকাশ, দিশারী, তানজিল, মেট্রোলিংক, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, রজনীগন্ধ্যা, মালঞ্চ, সময়, মিডলাইন, পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহন। নতুন ব্যবস্থায় এসব রুটে অন্য কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।