সড়ক পরিবহন খাতের যে চরম নৈরাজ্য, অসহনীয় যানজট আর মৃত্যুর মিছিল আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, তাকে আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ২০১৮ সালে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিশোর আন্দোলনের পর এখন আট বছর অতিবাহিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা এবং বাসকেন্দ্রিক একটি সুসংহত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাই যে এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির একমাত্র কার্যকর পথ, তা এখন সবারই জানা।
বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি সারা বিশ্বের জন্যই একটি পরীক্ষিত ও সফল গণপরিবহন পদ্ধতি। তবে এই মডেলটি যখন বাংলাদেশে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়। বরং বলা চলে, এই ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ব্যর্থ করে দেওয়ার সব ধরনের আয়োজন করা হয়েছিল। পুরোনো বাসগুলোকে নীল, হলুদ কিংবা সবুজ রঙ করে দু-একটি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছিল। যাত্রীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলেও বাস আসেনি।
গণপরিবহনব্যবস্থায় এই নৈরাজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি যে এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, তার প্রধান কারণ হলো—এই ব্যবস্থা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ও গোষ্ঠীর স্বার্থ ততই পুষ্ট হবে। প্রাকৃতিক হোক বা মানবসৃষ্ট, যেকোনো সংকট বা দুর্যোগ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। কানাডীয় রাজনীতি ও অর্থনীতি-বিশ্লেষক নওমি ক্লেইন একেই ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইরাক যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং পরবর্তী পুনর্গঠন ঘিরে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে, তা ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজমের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বড় ধরনের যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়মিত ঘটে না, সেখানে এই তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের ‘কুইক রেন্টাল’ প্রকল্প এর সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ। পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময়ে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ-সংকট তৈরি হয়েছিল, যার ফলে লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই বাস্তবতায় এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই-তিন বছরের জন্য যে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, আওয়ামী লীগ আমলে তা যেন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’ রূপ পেয়েছিল।
সড়ক পরিবহন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একে রাজনৈতিক-অর্থনীতির সমস্যা হিসেবে না দেখে কেবল কারিগরি সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে এর সমাধানগুলো আসে বিভিন্ন স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সুবিধা অনুযায়ী নেওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে।
পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও স্থায়ী ভোগান্তি বাংলাদেশকে এমন অনেক অবকাঠামো প্রকল্পের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য হতো না। যানজট কমানোর দোহাই দিয়ে একের পর এক উড়ালসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিটের মতো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি কেবল কমেছে।
সম্প্রতি সরকার ঢাকায় একসঙ্গে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, যার জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৫-৬ লাখ কোটি টাকা। এছাড়া ৮৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলসেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা একধাপে বাড়ানো হয়েছে এবং প্রতিযোগিতা করে বোয়িং ও এয়ারবাস কেনা হচ্ছে।
এত বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যে বিশাল ঋণের বোঝা তৈরি হবে, তা কীভাবে শোধ করা হবে—তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মুখে। এর সাথে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
এমন নাজুক পরিস্থিতিতে যেকোনো সরকারের উচিত হবে তার অগ্রাধিকার তালিকায় সবচেয়ে কম খরচে জনগণের কল্যাণের পথ বেছে নেওয়া। সরকার তার বাজেট বক্তৃতায় চলতি বছর ও আগামী বছরকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো সরকারের অর্থনৈতিক নীতি এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে এক ধরণের বৈপরীত্য স্পষ্ট করে তুলেছে।
মেট্রোরেল ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মানুষের যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে, যার ফলে অন্য অঞ্চলের নাগরিকদের মধ্যেও এর চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যে সময়ে এবং যে ব্যয়ে এই প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ বছর ধরে বলে আসছেন যে, ঢাকায় বাসকেন্দ্রিক একটি গণপরিবহনব্যবস্থাই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও সহজসাধ্য সমাধান।
সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠকে এক সাক্ষাৎকারে যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, “আমরা যদি পাঁচ-ছয় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত মেট্রোর মাধ্যমে ১৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করি, আর পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বাস ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে ৪০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করতে পারি, তাহলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রিটার্নের দিক থেকে কোনটি লাভজনক?” (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, মুক্তকণ্ঠ)
সরকার সম্প্রতি ঢাকায় ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর কথা বলেছে, যা একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে আগের মতো পুরোনো বাসে রং করে রাস্তায় নামালে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি আবারও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সড়ক পরিবহন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটাকে রাজনৈতিক-অর্থনীতির সমস্যা হিসেবে না দেখে কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সমাধানটা আসে বিভিন্ন স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থে নেওয়া বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে।
উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার যানজট নিরসনে বহু বছর ধরে আলোচিত একটি তত্ত্ব হলো—মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানের মতো বাস টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া। ধরা যাক, পরিকল্পনা অনুযায়ী এই টার্মিনালগুলো কাঁচপুর, কেরানীগঞ্জ কিংবা পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়া হলো।
প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনায় সাধারণ নাগরিকের কথা কি একবারও ভাবা হয়েছে? বাসে করে যারা ঢাকায় আসবেন কিংবা ঢাকা থেকে যারা বাইরে যাবেন, তাদের অর্থ ও সময়ের ব্যয় কতটা বাড়বে? বাস্তবতা হলো, একই যাত্রায় তাদের দুটি লং জার্নির অভিজ্ঞতা নিতে হবে। এছাড়া রাতবিরাতে যাতায়াতকারীদের ছিনতাইসহ নানা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
যানজট কমানোর দাওয়াই হিসেবে টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার তত্ত্বটি জনপ্রিয় হলেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। হাদিউজ্জামানের ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টি শেষ করা যাক। তাঁর মতে, “টার্মিনাল যতটা সম্ভব শহরের কাছাকাছি থাকা সুবিধাজনক। কারণ, গণপরিবহন ডোর-টু-ডোর সেবা দেয় না, এটি ব্যক্তিগত গাড়ি নয়। টার্মিনাল শহরের কাছাকাছি থাকলে যাত্রীর সময় কম লাগে, ব্যয়ও কমে।”
মূল সমস্যাটি হলো, আমরা টার্মিনালগুলোকে বাস ডিপো বানিয়ে ফেলছি। টার্মিনালকে টার্মিনাল এবং ডিপোকে ডিপো হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। নিয়ম হলো, ডিপো থেকে বাস টার্মিনালে আসবে, যাত্রী তুলবে এবং তারপর গন্তব্যে চলে যাবে। এটাই বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান এবং সঠিক নিয়ম।
— মনোজ দে, মুক্তকণ্ঠের সম্পাদকীয় সহকারী। (মতামত লেখকের নিজস্ব)