দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য এক নতুন ও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ইতোমধ্যে এই লক্ষ্যে একটি বিশেষ প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছে বোর্ড। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপটি দেশের অনেক ক্রিকেটারের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। তবে প্রস্তুতির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির বিস্তারিত বিবরণ এখনই প্রকাশ করতে রাজি হননি বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক।
সোমবার (২ নভেম্বর) মোবাইল অপারেটর রবি ও বিসিবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘রবি বোলার হান্ট’ প্রতিযোগিতার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তামিম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্ভাবনাময় বোলারদের খুঁজে বের করার এই আয়োজনের শেষ দিনে ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন বিসিবি সভাপতি।
ক্রিকেটারদের জন্য নতুন এই উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়ে তামিম বলেন, ‘আমি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নই, তবুও দেশজুড়ে অনেক ক্রিকেটারের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে এমন একটি ঘোষণা দেওয়ার খুব কাছাকাছি আমি পৌঁছে গেছি। আমি এবং আমার ক্রিকেট বোর্ড একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমরা তা ঘোষণা করতে পারব।’
তবে এই নতুন প্রকল্পের কার্যক্রম ঠিক কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা এর আওতায় সুযোগ পাবেন কিংবা ক্রিকেটাররা কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানাননি বিসিবি সভাপতি।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বোলার হান্টের চূড়ান্ত পর্বে যারা জায়গা করে নিতে পারেননি, সেই প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের উন্নতির জন্য আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছে বিসিবি। যারা প্রথম ধাপে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কার্যক্রমে সুযোগ পাবেন না, তাদেরও নিয়মিত অনুশীলন ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে চায় বোর্ড।
মূলত সমাপনী অনুষ্ঠানেই এই পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ করার কথা ছিল। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ না হওয়ায় ঘোষণাটি পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তামিম। ফলে প্রকল্পটির চূড়ান্ত কাঠামো এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি জানতে এখন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে আনার লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় শুরু হয়েছিল ‘রবি বোলার হান্ট’। এবারের আয়োজনে শুধু পেসার নয়, স্পিনারদেরও নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন নারী ক্রিকেটাররাও।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে শুরু হয় আঞ্চলিক বাছাই প্রক্রিয়া। দেশের আটটি বিভাগের নয়টি ভিন্ন স্থানে ট্রায়ালের আয়োজন করা হয়।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান বোলারদের খুঁজে বের করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে যেসব তরুণের পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশের সুযোগ কিংবা আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সীমিত, তাদের সামনে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের একটি মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া হয়।
বাসসের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বোলার হান্টে ২৫ হাজারের বেশি তরুণ ক্রিকেটার নিবন্ধন করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে ১৪৩ জন সম্ভাবনাময় বোলারকে চিহ্নিত করা হয়। এই তালিকায় ৫৭ জন পেসার ও ৮৬ জন স্পিনার ছিলেন। মোট অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১০৮ জন পুরুষ এবং ৩৫ জন নারী ছিলেন।
পরবর্তী ধাপে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও বাছাই ক্যাম্পের জন্য ৫৬ জন পেসারকে নির্বাচন করা হয়। তাদের মধ্যে ৫১ জন পুরুষ, তিনজন নারী এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা দুজন প্রতিযোগী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল চূড়ান্ত বাছাইয়ের মাধ্যমে ১২ জনকে বিসিবির এইচপি কার্যক্রমে নেওয়া হবে। তবে সমাপনী অনুষ্ঠানের পর নির্বাচিত প্রতিভাবান বোলারদের তালিকা আরও দীর্ঘ করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ২১ জনকে নির্বাচনের পাশাপাশি বিশেষ বিবেচনায় আরও দুই শিশু বোলারকে যুক্ত করেছে বিসিবি। তারা হলেন নয় বছর বয়সী সাইফ ও ১২ বছর বয়সী শোয়েব। ফলে মোট নির্বাচিত বোলারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।
বিশেষ করে সাইফের প্রতিভা নির্বাচকদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার এই শিশুটির আদর্শ দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ক্রিকেটার পল অ্যাডামস। সমাপনী অনুষ্ঠানে তামিমের সঙ্গে কথোপকথনের সময় গুগলিতে তাকে আউট করার ইচ্ছাও প্রকাশ করে সাইফ।
অন্যদিকে শোয়েবও নিজের বাঁহাতি স্পিন বোলিং দিয়ে নির্বাচকদের মুগ্ধ করেছেন। বয়স অত্যন্ত কম হলেও সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে দুজনকে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
নির্বাচিত এই ২৩ বোলারের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে বোর্ডের। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বিসিবির হাই পারফরম্যান্স কার্যক্রমে যুক্ত করা হতে পারে। পাশাপাশি অন্যদের উন্নতির ধারা যাতে অব্যাহত থাকে, সে জন্য বিকল্প প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কথা ভাবছে সংস্থাটি।
এই প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক লেগ স্পিনার মুশতাক আহমেদ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার কোরি কলিমোর এবং বাংলাদেশের কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন ও সোহেল ইসলাম। তারা তরুণ বোলারদের দক্ষতা, বোলিং অ্যাকশন, গতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করেছেন।
এর আগেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বোলার উঠে এসেছেন এ ধরনের প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম থেকে। রুবেল হোসেন, এবাদত হোসেন ও রিশাদ হোসেনের মতো ক্রিকেটাররা এমন উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সোমবারের অনুষ্ঠানে খেলাধুলার উন্নয়নে পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তামিম। তার মতে, শুধু অর্থায়ন নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারে এসব প্রতিষ্ঠান।
বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘যেকোনো স্পোর্টসের জন্য স্পন্সররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পন্সরদের যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং তারা যদি সঠিকভাবে কোনো পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারে, তবে তা শুধু ক্রিকেট নয়, সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনেই এক বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।’
রবির সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত বোলার হান্টকে সেই ধরনের একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বিসিবি। শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে নির্বাচিত ক্রিকেটারদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে বোর্ডের।