দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশে ফিরে নিজের ঘরেই ফেরার অনুভূতি লাভ করছেন ভারতের অভিজ্ঞ ক্রীড়া উপস্থাপক ও নিলাম পরিচালক চারু শর্মা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন ঘরোয়া আয়োজন 'ডমেস্টিক থ্রি' বা 'ডি থ্রি ট্রফি'র নিলাম পরিচালনা করার দায়িত্ব পালন করতে তিনি ঢাকায় এসেছেন। এই সফরের নেপথ্যে রয়েছে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের একটি ফোনকল। নিজের ব্যস্ত সূচির মাঝেও তামিমের অনুরোধটি উপেক্ষা করতে পারেননি চারু। বাংলাদেশে পুনরায় এসে তিনি দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ডি থ্রি ট্রফির নিলাম কার্যক্রমের মধ্যবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন চারু শর্মা। বাংলাদেশে ফেরার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আগেও কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছি। তবে এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। আবার এখানে ফিরতে পেরে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। তামিম ইকবালকে ধন্যবাদ। সে আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল, ডি থ্রির নিলাম পরিচালনা করতে পারব কি না। প্রথমে বলেছিলাম, ওই দিন কিছুটা ব্যস্ততা আছে। পরে জানালাম, সমস্যা নেই, সূচি ঠিক করে চলে আসব।’
বাংলাদেশের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে চারু বলেন, ‘এখানে ফিরে মনে হচ্ছে নিজের ঘরেই ফিরে এসেছি। এত বছর কেন আসিনি, সেটাই বুঝতে পারছি না। আবারও বলছি, তামিমকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে ফোন করার জন্য।’
ডি থ্রি ট্রফির সামগ্রিক পরিকল্পনা ও কাঠামোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন চারু শর্মা। তার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে পরবর্তী উচ্চতায় নিয়ে যেতে এই ধরনের প্রতিযোগিতার ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তিন ভিন্ন সংস্করণে খেলার সুযোগ তরুণ ক্রিকেটারদের প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জন্য বিপিএল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন তারকা তৈরির জন্য ডি থ্রি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। এখন বাংলাদেশের দারুণ একটি জাতীয় দল আছে। ভবিষ্যতেও সেই মান ধরে রাখতে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে।’
ডি থ্রির তিন সংস্করণের বিন্যাস সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘শুধু টি-টোয়েন্টি নয়, ৫০ ওভারের ক্রিকেট এবং দীর্ঘ সংস্করণেও খেলতে হবে। ডি থ্রির এই পরিকল্পনা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যথাযথ। আমার মনে হয়, খুব ভেবেচিন্তেই প্রতিযোগিতাটি সাজানো হয়েছে।’
বিসিবির এই নতুন প্রতিযোগিতার আওতায় একই ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি, ৫০ ওভার এবং চার দিনের ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করবে। আগামী ১৫ ডিসেম্বর টি-টোয়েন্টি সংস্করণ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ডি থ্রি ট্রফি। এরপর জানুয়ারিতে চার দিনের ম্যাচ এবং মে মাসে ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নিলামের প্রক্রিয়া ও পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন চারু। বিশেষ করে ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে যে তীব্র লড়াই দেখা গেছে, তা তাকে মুগ্ধ করেছে। তবে তার মতে, নিলামের উত্তেজনা কেবল শুরু হয়েছে।
চারু বলেন, ‘আমি দারুণ উপভোগ করছি। জানি, ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের জন্য অনেক পয়েন্ট খরচ হয়েছে। কিন্তু এখনো বি, সি, ডি ও ই ক্যাটাগরি বাকি। আরও অনেক নাটকীয়তা অপেক্ষা করছে, এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি ভারতীয় এই উপস্থাপকের নজর এড়ায়নি। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, এক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় দলগুলোর প্রতি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে অতিরিক্ত সমীহ বা জড়তা দেখা যেত, যা এখন আর নেই। ক্রিকেটারদের নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আত্মবিশ্বাস এখন অনেক বেশি।
চারু বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্ব ক্রিকেটে তোমরা এখন একটি শক্তি। আমার মনে হয়, বাংলাদেশকে নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একসময় এখানে ফুটবল কতটা জনপ্রিয় ছিল। সেখান থেকে ক্রিকেট দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হয়ে উঠেছে। এটা বিশাল পরিবর্তন।’
তবে বাংলাদেশকে আরও উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে হলে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করেন চারু। বড় প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানো উচিত, তবে তাদের সামনে নিজেদের ছোট করে দেখার মানসিকতা ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে চারু বলেন, ‘শুরুর দিকে বড় ক্রিকেটীয় দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশের কিছুটা অতিরিক্ত সমীহ ছিল। সেটা অবশ্য স্বাভাবিক। কিন্তু এখন তোমরা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছ। আমি কখনো চাই না বাংলাদেশ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠুক। তবে নীরব আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রতি তার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে চারু বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সব খেলোয়াড় যখন নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে সেই আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারবে, তখনই আমার মনে হবে তারা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
বাংলাদেশের সঙ্গে চারু শর্মার সম্পর্ক বেশ পুরনো। ২০০৪ সালে এই দেশে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্মৃতি তিনি এখনো মনে রেখেছেন। সেই সফরে অনেক বন্ধু তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় বাংলাদেশে এসে পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত এই অভিজ্ঞ নিলাম পরিচালক।