প্রয়োজনীয় সব দক্ষতা এখন আর কেবল পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কিংবা শিক্ষকরাই সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবেন—এমন প্রত্যাশায় বসে থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর এই পৃথিবীতে এই সত্যটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কীভাবে প্রস্তুত করছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। আমিনা মুমতারিন তাদের সাথে কথা বলেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাব্বির হোসেন জানান, তিনি প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন, সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। পড়াশোনা, গবেষণা এবং দৈনন্দিন কাজগুলোকে আরও সহজ, কার্যকর ও গতিশীল করতে তিনি চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনাই ও নোটবুকএলএম-এর মতো এআই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করছেন।
সাব্বির হোসেন বলেন, “এগুলোর কার্যকর ব্যবহার আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে তথ্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, লেখালেখি ও গবেষণার কাজে এআইকে আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাই।”
ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে তার নিজস্ব বিশ্বাস ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, আগামী বিশ্বব্যবস্থায় এআই আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রচলিত অনেক কাজের ধরন বদলে যাবে, কিছু কাজের চাহিদা কমবে, আবার তৈরি হবে নতুন নতুন পেশা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। তখন শুধু একাডেমিক যোগ্যতা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। বরং সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের দক্ষতাই একজন মানুষকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।”
অন্যদিকে, ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা মাহজাবিন মনে করেন, এআই ভবিষ্যতের কাজের ধরন বদলে দিয়ে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাবে। তাই তিনি প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
আনিকা মাহজাবিন জানান, বিবিএ পড়ার পাশাপাশি তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছেন, জটিল ধারণাগুলো সহজভাবে বুঝে নিচ্ছেন এবং নিজের লেখা ও চিন্তাভাবনাকে আরও সুসংগঠিত করছেন। পাশাপাশি কোর্সেরা, গুগল স্কিলশপ ও মাইক্রোসফট লার্নের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রযুক্তিগত ও পেশাদার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ খুঁজছেন তিনি।
চাকরির বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ধারণা, “আমার ধারণা, আগামী পাঁচ বছরে চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তন আসবে। কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমবে, আবার তৈরি হবে নতুন নতুন পেশার সুযোগ। সেই বাস্তবতায় শুধু ডিগ্রি নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ রাখার মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
তাই তিনি এআই-কে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে বরং শেখার ও এগিয়ে যাওয়ার সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে নিজেকে ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য প্রস্তুত করছেন।
একই সাথে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি–বাংলাদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আশিক আদনান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য কেবল একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়, বাস্তব দক্ষতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি এআই টুলের কার্যকর ব্যবহার শেখা, যোগাযোগ ও উপস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
আশিক আদনান জানান, ইন্টার্নশিপ, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে আরও এগিয়ে নিতে চান। ইংরেজিতে দক্ষতার পাশাপাশি চীনা ও জাপানি ভাষা শেখার প্রতিও তার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। কারণ, নতুন ভাষা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ এবং পেশাগত সুযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আগামী পাঁচ বছরে এআই চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তন আনবে, তবে এর ফলে তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনাও। এ কারণে আমি এই পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়; বরং শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে চাই।”
প্রযুক্তির সাথে নিজের সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি এবং মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে নিজেকে আরও যোগ্য করে তোলাই এখন তার মূল লক্ষ্য।