কুমিল্লায় সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করে বর্তমানে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন হালিমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কালাম হাসান। ২০১০ সালে হালিমা টেলিকম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর ব্যবসায়িক পথচলা শুরু হয়। কুমিল্লার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপায় নিয়ে তিনি মুক্তকণ্ঠের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কুমিল্লার প্রতিনিধি আবদুর রহমান।

কুমিল্লার অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যবর্তী এই জেলাটিকে একটি বৃহৎ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আবুল কালাম হাসান বলেন, “কুমিল্লা শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি। গত ৫ থেকে ১০ বছরে কুমিল্লা ও আশপাশের অনেক মানুষ প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশে কাজ করা দক্ষ তরুণদের অনেকে দেশে ফিরছেন। তাঁদের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। কুমিল্লায় ইপিজেড আছে, কৃষি ও মৎস্য খাত ভালো করছে। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝখানে অবস্থিত হলেও কুমিল্লা বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। তাই কুমিল্লাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এতে শিল্প-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।”

আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে ইপিজেড বহির্ভূত কোন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সে বিষয়ে তিনি মনে করেন প্রযুক্তিশিল্পের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি নিজেই কুমিল্লায় মুঠোফোনের সরঞ্জাম ও মুঠোফোন তৈরি করছেন, যা প্রমাণ করে যে ঢাকার বাইরেও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন সম্ভব। তিনি আরও জানান, লালমাইয়ে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭ দশমিক ৮৮ একর জমিতে নলেজ পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর জানামতে, “কাজ অনেক আগে শেষ হলেও এটি এখনো চালু হয়নি। এটি চালু করে তরুণদের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।” তিনি বিশ্বাস করেন, কুমিল্লার শিক্ষিত তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারলে এই জেলাটি একটি বড় প্রযুক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যার ফলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।

কুমিল্লায় নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে তিনি প্রশাসনিক জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, জমি ক্রয় কিংবা ব্যাংকঋণের জন্য সম্পত্তি বন্ধক রেখে কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়ায় নিবন্ধনের কাজে তাঁকে ১৫ থেকে ২০ দিন রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুরতে হয়েছে। তাঁর মতে, অনেক ব্যবসায়ীই এই ধরনের সমস্যায় ভোগেন। তাই ওয়ান–স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন নিয়েও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, “বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা নিবন্ধন, কর ও ভ্যাটের প্রক্রিয়া দেখে ভয় পেয়ে যান। শুরুতেই কাগজপত্র সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ কমে যায়। সে জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।”

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি নিজেও একসময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ছিলেন এবং ধাপে ধাপে ব্যবসা বড় করেছেন। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান নিয়মকানুন অত্যন্ত জটিল। ব্যাংকঋণ নিতে তাঁদেরও বড় ব্যবসায়ীদের মতো সব কাগজপত্র জমা দিতে হয়, যা প্রস্তুত করতে গিয়েই অনেক সময় তাঁদের পুঁজি শেষ হয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, ব্যবসার আকার অনুযায়ী আইন ও নিয়মকানুন হওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য একই প্রক্রিয়া থাকবে—এটা হতে পারে না। ব্যাংকঋণের শর্ত সহজ করার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুরুতেই তাঁদের নিরুৎসাহিত করা হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না।”

কুমিল্লার নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের বর্তমান অবস্থা ও করণীয় সম্পর্কে তিনি জানান, তাঁর বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক কর্মরত আছেন, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামীণ নারী। তাঁরা মুঠোফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করছেন। তিনি মনে করেন, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে নারীরা প্রযুক্তিশিল্পেও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। এছাড়া কুমিল্লার নারীরা এখন এসএমই খাতে পোশাক, হস্তশিল্প ও খাবারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বড় কোনো উদ্যোগে তাঁদের অংশগ্রহণ নেই। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তাদের পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ বাড়াতে হবে। পোশাক, সেলাই ও প্রসাধনসামগ্রী নিয়ে যাঁরা উদ্যোগ নিতে চান, তাঁদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”

তরুণদের ই-কমার্স ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ঘরে বসেই অনেকে মধু, ঘি, জামাকাপড়, মাছ, জুতা কিংবা হস্তশিল্প পণ্য অনলাইনে বিক্রি করছেন। এমনকি রান্নায় দক্ষ তরুণেরা ছোট পরিসরে খাবারের ব্যবসা করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তরুণদের উচিত নিজের পড়াশোনা ও দক্ষতার সঙ্গে মিল রেখে ব্যবসা শুরু করা। শুধু অন্যের পরামর্শে বা ইউটিউবের অনুপ্রেরণায় উদ্যোগ নেওয়া ঠিক নয়; বরং পণ্য তৈরি থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত ব্যবসার প্রতিটি ধাপ বুঝতে হবে।

হালিমা গ্রুপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আবুল কালাম হাসান জানান, তিনি হালিমা গ্রুপকে কুমিল্লার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বড় করতে চান। তাঁর প্রধান কার্যালয় ও কারখানা এখানেই অবস্থিত এবং এখান থেকেই তিনি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তিনি বলেন, “আমরাও কুমিল্লায় এআই নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছি।” বর্তমানে তাঁর কারখানায় দেশের ১১টি ব্র্যান্ডের মুঠোফোন তৈরি করা হয়, যা মূলত গ্রামের নারীরাই করছেন। এর ফলে অনেক শ্রমিক মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি মনে করেন, স্থানীয়ভাবে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা পরিবারের আয় বাড়ায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

আগামী এক দশকে কুমিল্লাকে বিনিয়োগবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার উপায় হিসেবে তিনি তিনটি প্রধান পদক্ষেপের কথা বলেন। প্রথমত, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করে যাতায়াতের সময় কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কুমিল্লা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, হাইটেক পার্ক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে আমরা কুমিল্লাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই, তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। সরকার ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা একত্রে কাজ করলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর কুমিল্লা দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর হয়ে উঠতে পারে। মানুষের জন্য নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।”