দীর্ঘদিন অচল হয়ে পড়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি বস্ত্রকল নীলফামারীর দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস ও মাগুরা টেক্সটাইল মিলস সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই মিল দুটি বেসরকারি খাতের কাছে ছেড়ে দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করেছে। আগামী মাসেই এই হস্তান্তরের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পিপিপি পদ্ধতিতে ৩০ বছরের জন্য দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস ইজারা পাচ্ছে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড (সিএইচপি) এবং মাগুরা টেক্সটাইল মিলস ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। বন্ধ হয়ে যাওয়া এই কারখানা দুটিতে পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এই উদ্যোগের ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৮ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বিটিএমসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসের মাঝামাঝির দিকে বন্ধ কারখানা দুটি পিপিপিতে চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই শিল্পগ্রুপের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। গত বছরের জুলাই মাসে দারোয়ানী ও মাগুরা টেক্সটাইল মিলস পিপিপিতে চালুর লক্ষ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আগ্রহপত্র আহ্বান করেছিল বিটিএমসি। অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদন করার পর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপকে চূড়ান্ত করে করপোরেশন। গত মাসে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা ও পিপিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কাজী ফিরোজ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টসকে পিপিপিতে ৩০ বছরের জন্য বস্ত্রকল দুটি ইজারা দেওয়া হচ্ছে। তবে মিল দুটির ব্যবস্থাপনায় করপোরেশনের কর্মকর্তারাও যুক্ত থাকবেন। মিলের জমি বা অন্য সম্পদ যাতে বেহাত না হয়, সেটি তাঁরা তদারকি করবেন। তবে কারখানা পরিচালনা ও হিসাব–নিকাশের ক্ষেত্রে করপোরেশনের কোনো যুক্ততা থাকবে না।”

বিনিয়োগের খতিয়ান অনুযায়ী, বন্ধ মাগুরা টেক্সটাইল মিল চালু করতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ৪০০-৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। অন্যদিকে, দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলসে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস।

বিটিএমসি মোট ১৬টি বস্ত্রকলকে পিপিপিতে চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত চারটি বস্ত্রকল বেসরকারি অংশীদারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের আর আর টেক্সটাইল মিলস, রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস, ঢাকার ডেমরার আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিলস এবং গাজীপুরের কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলস। এছাড়া আরও চারটি বস্ত্রকল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে করপোরেশন। এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের ভালিকা উলেন মিলস ও সিলেট টেক্সটাইল মিলস বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়া হয়েছে।

নীলফামারীতে ১৯৭৭ সালে প্রায় ৩৮ একর জমির ওপর দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে পণ্য উৎপাদন করলেও পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন দশক পর এখন এই মিলটি পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। বিটিএমসি সূত্রে জানা গেছে, এখানে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বৈচিত্র্যময় হস্তপণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করবে। প্রতিষ্ঠানটি এই কারখানায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রতিষ্ঠানটি শতরঞ্জি, ঝুড়ি, শপিং ব্যাগ, কুশন কাভারের পাশাপাশি রান্নাঘর, পোষা প্রাণী ও বাগানসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে। এসব পণ্য তৈরিতে কলাগাছের খোল, আনারসের পাতা, পাটের আঁশ, বাঁশ, বেত, খেজুরপাতা, তালের আঁশ, ধঞ্চে, কচুরিপানা ও ভুট্টার খোসার মতো প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়। তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রায় সবটুকুই জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ বিশ্বের ৩৯টি দেশে রপ্তানি হয়। উদ্যোক্তা মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালামের প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে নীলফামারী, বগুড়া ও রংপুরে ছয়টি কারখানা রয়েছে, যেখানে ২৮৩ ধরনের পণ্য তৈরি হয় এবং ৩ হাজার ৩০০ কর্মী কর্মরত আছেন। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের হস্তপণ্য রপ্তানি করেছে।

ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলসে আমরা একটি পরিপূর্ণ ক্রাফট ভিলেজ তৈরির পরিকল্পনা করছি। সেখানে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত, পণ্য উৎপাদন ও পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে। কারখানা হবে পরিবেশবান্ধব। পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া চলবে সৌরবিদ্যুতে। পরিকল্পনামফিক সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে বছরে ৬ কোটি ডলারের হস্তপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে এই কারখানা থেকে।”

অন্যদিকে, ১৯৮১ সালে ১৬ দশমিক শূন্য ৬ একর জমির ওপর মাগুরা টেক্সটাইল মিলস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে ছিল। এখন বিটিএমসি-র উদ্যোগে এটি পিপিপিতে চালুর প্রক্রিয়া চলছে। জানা গেছে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এখানে ৪০০-৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাগেজ, বহুমুখী পাটপণ্য, ইলেকট্রনিকস ও খেলনা উৎপাদন করবে, যাতে প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি বরেন্দ্র রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস ও রাজশাহী জুট মিলস পিপিপিতে চালু করেছে। রাজশাহী টেক্সটাইল মিলসে ব্যাগ এবং পাটকলের কারখানায় জুতা, তাঁবু ও ছাতা তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে জুতা ও তাঁবু রপ্তানি করা হচ্ছে। ওই দুই কারখানায় ইতিমধ্যে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রপ্তানির জন্যই মাগুরা টেক্সটাইল মিলসে আমরা পণ্য উৎপাদন করব। আগামী মাসে চূড়ান্ত চুক্তির পর মিলটি বুঝে পেলে আগামী বছরের শুরুতে উৎপাদনে যেতে পারব। কারখানা ভবন আছে। শুধু কিছু সংস্কার করেই আমরা পণ্য উৎপাদন শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।”