বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে বায়ুদূষণ রোধে উদ্যোগ নিয়েছিল বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা। তাদের অনুরোধেই দীপাবলির সময় আতশবাজির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতামূলক ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিয়া মির্জা। তবে বিজেপি ও শিবসেনার তীব্র আপত্তির মুখে পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সেই ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের পেছনে দিয়ার ‘ধর্ম’ বা ধর্মীয় পরিচয় প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দিয়া মির্জার পারিবারিক পরিচয় বেশ বৈচিত্র্যময়। তাঁর বাবা ফ্র্যাঙ্ক হ্যান্ডরিচ ছিলেন জার্মান খ্রিষ্টান এবং পেশায় গ্রাফিকস ডিজাইনার। মা দীপা, যিনি পশ্চিমবঙ্গের একজন বাঙালি হিন্দু এবং পেশায় ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। জন্মের চার বছর পর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে দিয়ার মা হায়দরাবাদের আহমেদ মির্জাকে বিয়ে করেন। তাঁর স্নেহ ও তত্ত্বাবধানেই দিয়া বড় হন এবং সৎবাবার ‘মির্জা’ পদবিটিই ব্যবহার করে আসছেন।
৪৪ বছর বয়সী এই অভিনেত্রীর জীবনে দুইবার বিয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন সাহিল সাংঘা। পরবর্তীতে ২০২১ সালে তিনি বৈভব রেখি নামের একজন হিন্দু ব্যবসায়ীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
উল্লেখ্য, পৌরসভার অনুরোধে পরিবেশ দূষণ ও আতশবাজির বিরুদ্ধে দিয়া মির্জা ছাড়াও ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত, ক্রিকেটার অজিঙ্কা রাহানে এবং মারাঠি সিনেমার জনপ্রিয় তারকা নিশিগন্ধা ওয়াডের মতো ব্যক্তিত্বরা। তবে তাঁদের ভিডিওগুলো পৌরসভার প্ল্যাটফর্মে বহাল থাকলেও একমাত্র দিয়া মির্জার ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়েছে।
উৎসবের সময়ে আতশবাজির কারণে বায়ুদূষণ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার ব্যর্থতায় বম্বে হাইকোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। গত ১৫ অক্টোবর হাইকোর্ট পৌরসভাকে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে পরিচিত তারকাদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেয়।
আদালতের সেই নির্দেশনা অনুযায়ী বিনোদন জগতের বিভিন্ন তারকাকে অনুরোধ জানায় পৌরসভা। দিয়া মির্জা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এই জনহিতকর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। বম্বে পৌরসভার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল যে, জনস্বার্থে এই ধরনের কাজে তারকাদের থেকে পারিশ্রমিক নেওয়া অনুচিত।
আদালতের নির্দেশ মেনে বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তারকার আবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের চাপ এবং তীব্র বিরোধিতার মুখে বিজেপি ও শিবসেনা পরিচালিত পৌরসভা দিয়ার ভিডিওটি সরিয়ে দেয়।
বিজেপির মুম্বাই শাখার সভাপতি অমিত সাটম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা পোস্ট করে পৌরসভাকে ট্যাগ করে লেখেন, “দীপাবলি কীভাবে উদ্যাপন করা উচিত, সেই জ্ঞান আমরা দিয়া মীর্জার কাছ থেকে নেব না। আমাদের সংস্কৃতির শিকড় আমাদের ঐতিহ্যেই নিহিত রয়েছে।”
অমিত সাটমের এই পোস্টের পর আরও বেশ কয়েকজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানান। এর পরপরই বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা দিয়ার ভিডিওটি মুছে ফেলে, যদিও অন্য তারকাদের পোস্টে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পৌরসভার একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশেই এই প্রচারাভিযান চালানো হয়েছিল এবং সেখানে নিয়মমাফিক বাজি পোড়ানোর বার্তা ছিল। তবে কেবল জনরোষের কারণে একজন বিশেষ ব্যক্তির ভিডিও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে স্বচ্ছতা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রচারের জন্য পৌরসভা অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে কাজে লাগিয়েছিল।
দিয়া মির্জার ভিডিও সরানোর বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র শরিক রিপাবলিকান পার্টির নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়াল এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বলেন, “দিয়া অভিনেত্রী। তিনি মুসলিম। তবে এটা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়। ভারতের সংবিধান সব ধর্মের মানুষদের নিজস্ব উৎসব পালনের অধিকার দিয়েছে। হিন্দুরা যেমন ঈদ উৎসবে যোগ দেন, মুসলিমরাও তেমন দীপাবলি পালন করেন। বাজি পোড়ানো দীপাবলির অঙ্গ। তা বন্ধ করা হলে দীপাবলির কিছু তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তবে অবশ্যই অতিরিক্ত দূষণ নিয়ে আমাদের সবারই সতর্ক থাকা উচিত। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কারণ আছে।”
শিবসেনার মুখপাত্র শায়না এনসিও এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, “দীপাবলি আলোর উৎসব। দিয়া মির্জার নামেও ‘দীপ’ রয়েছে। দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় আবেগ কতটা, তা ওঁর বোঝা উচিত। কেউ দূষণ ছড়ানো বা আতশবাজি পোড়ানোর প্রচার করছে না। আমাদের নিজেদেরও আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন আছে। মুম্বাইয়ের জনগণের কী করা উচিত, সে বিষয়ে অন্য কারও কাছ থেকে উপদেশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
অন্যদিকে, মুম্বাইয়ের মেয়র ও বিজেপি নেত্রী রীতু তাওড়ে এই সিদ্ধান্তের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দিয়া মির্জাকে হিন্দুত্ববিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, “এর সঙ্গে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের যোগসাজশ নেই। দিয়া মির্জা বারবার হিন্দুত্ববিরোধী ভূমিকা নিয়েছেন। সরকারবিরোধী মন্তব্য করেছেন। অতীতে দেখেছি, তিনি সব সময় বেছে বেছে কিছু বিষয়ের বিরোধিতা করেন। সেটা করার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু বৃহন্মুম্বাই পৌরসভার হ্যান্ডলে তা করা যাবে না।”
রীতু তাওড়ে আরও দাবি করেন, “দিয়া মির্জার হিন্দুত্ববিরোধী অবস্থানের জন্যই ওঁর বার্তা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।”
কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের এই আপত্তি এবং পৌরসভার সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দিয়া মির্জা। সোমবার তিনি বলেন, “বম্বে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাকে দিয়ে তারাই ভিডিও রেকর্ড করিয়েছে, তা নিয়ে অন্যরা কেন সমালোচনা করবেন?”
দিয়া আরও বলেন, বায়ুদূষণ একটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এবং মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সবারই দূষণ কমানোর চেষ্টা করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, “এই কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দাবি করিনি। ভালো কাজের দিন আর নেই।”
তবে এই ঘটনায় দিয়া মির্জার পাশে দাঁড়িয়েছেন হায়দরাবাদের দল অল ইন্ডিয়া মজলিস ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) মুখপাত্র ওয়ারিশ পাঠান। তিনি ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন, “অমিত সাটম, শুধু দিয়া মির্জাকেই কেন বাছলেন? একই আবেদন তো মাধুরী দীক্ষিতও করেছেন? নিশিগন্ধা ওয়াডও করেছেন? তাহলে কেন এই ভিন্নতা? একে ঐতিহ্যের পক্ষে দাঁড়ানো বলে না। বেছে বেছে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে দ্বিমুখী নীতিরই পরিচয় পাওয়া যায়। আসল কথা হলো, তাঁর নাম। নামটা দিয়া মির্জা। তাই না?”