বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ২০টি শহরের মধ্যে ১৭টিই এই দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত। বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন এখন দূষণের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার ফলে লাখো মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশদূষণ রোধ করা সম্ভব হলে কেবল প্রকৃতিই রক্ষা পাবে না, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও নিশ্চিত হবে।
ব্ল্যাক কার্বন এবং অন্যান্য পরিবেশদূষণকারী উপাদান নিয়ে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-নীতিবিষয়ক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আজ রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। পুরো আয়োজনটিতে সহযোগিতার providing ছিল ক্লিন এয়ার ফান্ড।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “পরিবেশের বিপর্যয় রাতারাতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে।” কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সমালোচনা করে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁরা বেহাল পরিবেশ পেয়েছেন এবং বর্তমান সরকার এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন যুক্ত হবে, যার মধ্যে ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে ঢাকায়।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ওই সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্পের সঙ্গে মেগা দুর্নীতি এবং মেগা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে।” তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ের কিছু পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। বিশেষ করে দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের পরিবর্তে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালু এবং পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই পরিবেশবান্ধব কাজ করেছে।”
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল অ্যাটমসফেরিক কেমিস্ট্রি (আইজিএসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের (এইচইআই) গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস ওভারসাইট কমিটির সহসভাপতি। অধ্যাপক আবদুস সালাম তাঁর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে বায়ুদূষণ, বিশেষ করে ব্ল্যাক কার্বনের উৎস, পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অধ্যাপক সালাম জানান, ব্ল্যাক কার্বনকে এলিমেন্টাল কার্বন বা সুট পার্টিকলও বলা হয়। এটি মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি, জৈব জ্বালানি ও জৈব পদার্থের অসম্পূর্ণ দহনের ফলে তৈরি হয়। ডিজেলচালিত ইঞ্জিন, শিল্পকারখানা, ইটভাটা এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য ও অন্যান্য উপাদান পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত।
ব্ল্যাক কার্বনের ভয়াবহ প্রভাব ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক সালাম বলেন, “সমপরিমাণ ভরের হিসাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় ব্ল্যাক কার্বনের উষ্ণায়ন ক্ষমতা ১০০ থেকে ১ হাজার গুণ বেশি।” তাই এর নিঃসরণ কমাতে পারলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বাতাসের সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বনের কণা হিমালয়ের বরফ, হিমবাহ ও তুষারস্তরে জমা হয়। এতে বরফের উপরিভাগ কালচে হয়ে সূর্যের আলো বেশি শোষণ করে, ফলে বরফ দ্রুত গলে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের মিঠাপানির সরবরাহের ওপর। এছাড়া বায়ুমণ্ডলে ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট তাপ আঞ্চলিক জলচক্র, মেঘ সৃষ্টি ও মৌসুমি বায়ুর ধরনেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে অধ্যাপক সালাম সতর্ক করে বলেন, ব্ল্যাক কার্বন পিএম ২.৫-এর অন্যতম উপাদান। এর সূক্ষ্ম কণা শ্বাসতন্ত্রের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এর উচ্চ ঘনত্ব শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে তিনি যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলা, ঘরের রান্নার ধোঁয়া, ইটভাটা, বর্জ্য পোড়ানো, শিল্পকারখানা এবং আন্তসীমান্ত দূষণের কথা উল্লেখ করেন।
শীতকালীন আন্তসীমান্ত দূষণের বিষয়টি তুলে ধরে অধ্যাপক সালাম বলেন, “নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল থেকে দূষিত বায়ু বাংলাদেশ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের দিকে যায়।” এই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বায়ুদূষণের পেছনে অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা দূষণেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক উদাহরণও তিনি দেখান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দুই স্ট্রোক ইঞ্জিন নিষিদ্ধ করার পর ব্ল্যাক কার্বনের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৪০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমে বর্তমানে ৬ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে। দূষণ কমাতে তিনি যানবাহন ও শিল্পকারখানার নিঃসরণ মানদণ্ড কার্যকর করা, পুরোনো ও অনুপযোগী যানবাহন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহন বাড়ানো, নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধের সুপারিশ করেন। পাশাপাশি ইটভাটায় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওয়ার গুসপাফসন বলেন, ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে দূষিত শহরের ১৭টিই এই অঞ্চলে অবস্থিত।
সেমিনারে আরও বক্তব্য প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এসডিজিবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক এস এম আবদুল আউয়াল, ঢাকায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাম উইকস, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোতালিব, মালদ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আহমেদ মুসলিম, ভারতের ইনস্টিটিউট ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আলী রেজা এবং ভারতের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিজ্ঞানী কৃষ্ণকান্ত বুদ্ধভান্ত।